
স্বাধীন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের পেছনের গল্প এবার সামনে এল। রাম মন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রাক্তন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি নৃপেন্দ্র মিশ্র এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই বিশাল কর্মকাণ্ডের খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন। এশিয়ানেট নিউজেবলকে দেওয়া এই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরির প্রযুক্তিগত, প্রশাসনিক এবং আধ্যাত্মিক দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, তীর্থযাত্রীদের বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা দিতে এখনও কী কী কাজ বাকি রয়েছে।
নৃপেন্দ্র মিশ্র জানিয়েছেন, আজ মন্দির দেখে সবকিছু সহজ মনে হলেও, নির্মাণের প্রতিটি ধাপে জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ ছিল। সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বাধাগুলোর মধ্যে একটি ছিল টাইটেনিয়ামের যন্ত্রাংশ নিয়ে। ইঞ্জিনিয়াররা দেখেন যে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ৫২ শতাংশেরও বেশি ধাতু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য কমিটি প্রাইভেট সেক্টরের বিশেষজ্ঞ-সহ একাধিক পেশাদারের মতামত নেয়। এরপরই একটি প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক এবং আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী সমাধান বের করা হয়।
রাম মন্দিরকে "ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত একটি স্বপ্ন" বলে উল্লেখ করে মিশ্র জানান, এর কৃতিত্ব কোনও একজন ব্যক্তির নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভক্ত, সাধু এবং পণ্ডিতদের, যারা ভেবেছিলেন ভগবান রামের মন্দির কেমন হওয়া উচিত। মন্দিরের প্রতিটি শৈল্পিক সিদ্ধান্ত, এমনকি সাধুদের ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপনের ক্ষেত্রেও বেদ, পুরাণ এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল ৭৯ জন সাধু ও ব্যক্তিত্বকে বেছে নেয়, যাদের জীবন মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামের আদর্শকে প্রতিফলিত করে।
মন্দিরের কাজ নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে মিশ্র একটি অকপট উত্তর দেন। তিনি বলেন, "ভক্তদের মুখের অভিব্যক্তি দেখেই আমার সন্তুষ্টি আসবে।" তাঁর মতে, এই প্রকল্পের বিচার শুধু স্থাপত্য দিয়ে নয়, বরং তীর্থযাত্রীরা কতটা আরামে দর্শন করতে পারছেন, তা দিয়ে হওয়া উচিত।
নৃপেন্দ্র মিশ্র অনুমান করেন যে, তীর্থযাত্রীদের দৃষ্টিকোণ থেকে মন্দিরের পরিকাঠামো বর্তমানে "প্রায় ৬০ শতাংশ সম্পূর্ণ"। এখনও বেশ কিছু উন্নতির কাজ বাকি রয়েছে। যেমন, একাধিক ভাষায় সাইনবোর্ড, আরও পানীয় জলের ব্যবস্থা, ছায়াযুক্ত হাঁটার পথ, জুতো রাখার উন্নত ব্যবস্থা, সহজে প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ এবং বয়স্ক ও সারা ভারত থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা।
নৃপেন মিশ্র আরও জানান যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পরিকল্পনা পর্যায়ে একটি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন—রাম মন্দিরকে যেন কখনও শুধু উত্তর ভারতের মন্দির বলে মনে না হয়। বরং এটি সনাতন ধর্মের বৃহত্তর চেতনাকে প্রতিফলিত করবে, যা প্রতিটি অঞ্চল, ভাষা এবং ঐতিহ্যের ভক্তদের স্বাগত জানাবে।
এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে মন্দিরের ৭১ একরের বিশাল কমপ্লেক্সের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে এখানে একটি থ্রি-ডি রামকথা মিউজিয়াম, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য বড় অডিটোরিয়াম, উন্নত উদ্যান, তীর্থযাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা, জলাশয় ব্যবহার করে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং রাম জন্মভূমি আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী কর সেবকদের স্মরণে স্মারক তৈরি করা হবে।
নৃপেন মিশ্র ব্যাখ্যা করেন যে, অযোধ্যার তীব্র গরমেও যাতে তীর্থযাত্রা আরামদায়ক হয়, তার জন্য প্রাকৃতিক শীতলীকরণ কৌশল, আচ্ছাদিত হাঁটার পথ, পানীয় জলের স্টেশন এবং ছায়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দর্শনার্থীদের মতামত নিয়ে ক্রমাগত উন্নতির কাজ চলছে, তাই এই প্রকল্পটি একটি সমাপ্ত সৌধ না হয়ে, একটি চলমান প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে।
নিজের ব্যক্তিগত যাত্রার কথা বলতে গিয়ে মিশ্র জানান, রাম মন্দির প্রকল্পটি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বদলে দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে জনপ্রশাসনে কাজ করার পর, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরেও, তিনি একসময় সাফল্যকে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চোখে দেখতেন। কিন্তু মন্দিরের কাজে পাঁচ বছর সময় কাটানোর পর তিনি বিনয়ী হতে শিখেছেন।
তিনি আধ্যাত্মিক গুরু মাতা অমৃতানন্দময়ীর একটি বার্তার কথা স্মরণ করেন। মাতা তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ঈশ্বরের দ্বারা নির্বাচিত "একটি যন্ত্র মাত্র", যিনি একটি ঐশ্বরিক দায়িত্ব পালন করেন। এই বার্তাটি নেতৃত্ব এবং সেবা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দেয়।
মিশ্রের মতে, এই প্রকল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল সম্মিলিত অংশগ্রহণের মনোভাব। ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদার, কারিগর এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলো শুধুমাত্র পেশাদার হিসেবে নয়, ভক্ত হিসেবে এগিয়ে এসেছে। বেশ কয়েকটি সংস্থা স্বেচ্ছায় তাদের পেশাগত ফি মকুব করে দিয়েছে, তাদের কাজকে ভগবান রামের প্রতি উৎসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে। সারা দেশের ৪ লক্ষেরও বেশি গ্রামের ১০ কোটিরও বেশি পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৩,২০০ কোটি টাকার অনুদানে এই মন্দির তৈরি হয়েছে।
মিশ্রের জন্য সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল "ঈশ্বরের টাকা" রক্ষা করা, যে কথাটি তিনি বারবার বলেছেন। তাঁর কথায়, প্রতিটি খরচ জবাবদিহিতা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে খতিয়ে দেখা হয়েছে, কারণ এই মন্দির লক্ষ লক্ষ ভক্তের।
নির্মাণ কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে রাম মন্দির শুধুমাত্র একটি স্থাপত্যের বিস্ময় হিসেবেই নয়, বিশ্বাস, সেবা এবং জাতীয় অংশগ্রহণের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবেও উঠে আসছে। এশিয়ানেট নিউজেবলের সঙ্গে এই বিশেষ কথোপকথনে নৃপেন্দ্র মিশ্র স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মন্দিরের কাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ হলেও, প্রতিটি ভক্তের জন্য আদর্শ তীর্থযাত্রার অভিজ্ঞতা তৈরির মিশন সবে শুরু হয়েছে।