
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে গঠিত ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (সিসিএস), ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য আটটি ‘নেক্সট-জেনারেশন করভেট’ (এনজিসি) বা পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজ তৈরির একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। যুদ্ধজাহাজগুলো তৈরি করবে দুটি সরকারি শিপইয়ার্ড—কলকাতার ‘গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ (জিআরএসই) এবং ‘গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড’ (জিএসএল)। বুধবার অনুষ্ঠিত সিসিএস-এর বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই আটটি যুদ্ধজাহাজ তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট শিপইয়ার্ডগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এটিই প্রথম বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্প, যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদন পেল। এই প্রকল্পটি নৌবাহিনীর সারফেস ফ্লিট বা নৌবহরকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় গতি সঞ্চার করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পরবর্তী প্রজন্মের এই আটটি করভেট হবে প্রায় ২,০০০ টন ওজনের উচ্চগতির যুদ্ধজাহাজ, যার গতিবেগ হবে প্রায় ৩০ নট। উন্নত নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতীয় নৌবাহিনী নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এগুলোর জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক ‘স্টেলথ’ (রাডারে সহজে ধরা পড়ে না এমন) নকশা তৈরি করেছে। বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী করে নকশা করা এই যুদ্ধজাহাজগুলো বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা মিশন পরিচালনায় সক্ষম হবে। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে শত্রুর মোকাবিলা, সাবমেরিন-বিরোধী অভিযান এবং আকাশপথে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কাজ।
এগুলো উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক টহল, এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্যও উপযুক্ত হবে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (আইওআর) নৌবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের অপারেশনাল প্রয়োজনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এগুলোর স্টেলথ বৈশিষ্ট্য, অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সেন্সর এবং দ্রুত দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা নৌবাহিনীর ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগ এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, এই প্রকল্পে ৭০ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপাদান (ইন্ডিজেনাস কন্টেন্ট) ব্যবহার করা হবে। ভারতে এই আটটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের বিষয়টি সরকারের ‘সাগর’ (SAGAR - Security and Growth for All in the Region) বা ‘এই অঞ্চলে সবার জন্য নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধি’—এই ভিশনকেও এগিয়ে নিয়ে যাবে। ৪০,০০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই অর্ডারটি কলকাতার জিআরএসই (GRSE) এবং গোয়ার গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেডের (Goa Shipyard Limited) মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। এর ফলে উভয় শিপইয়ার্ড দীর্ঘমেয়াদী কাজের নিশ্চয়তা পাবে এবং এমএসএমই (MSME) ইকোসিস্টেম জুড়ে হাজার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রথম করভেটটির নির্মাণকাজ এক বছরের মধ্যেই শুরু হতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম জাহাজটি হস্তান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং নির্মাণের সময়সীমা এগিয়ে আনার জন্য প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রতিরক্ষা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে যুদ্ধজাহাজগুলো হস্তান্তর শুরু হতে পারে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ—বিশেষ করে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি—মোকাবিলার লক্ষ্যে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের নৌবহরকে আধুনিক করে তুলছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়াই আরও গতি পাবে। এই নতুন অনুমোদনটি নৌবাহিনীর চলমান যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ কর্মসূচির একটি অংশ। এই কর্মসূচির আওতায় নীলগিরি-শ্রেণির ফ্রিগেট, পরবর্তী প্রজন্মের ডেস্ট্রয়ার এবং নৌবহর সহায়তা জাহাজ (ফ্লিট সাপোর্ট শিপ) নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।