
শুক্রবার সরকার দেশের 'E20 ইথানল ব্লেন্ডিং' (পেট্রোলের সঙ্গে ২০ শতাংশ ইথানল) কর্মসূচি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া তথাকথিত ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে বিস্তারিত জবাব দিয়েছে। এতে অতিরিক্ত জল ব্যবহার, ইঞ্জিনের ক্ষতি, বিমা বাতিল এবং পরিবেশগত ক্ষতির মতো দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক ১০-দফা স্পষ্টীকরণে জানিয়েছে যে, এই কর্মসূচি—যার আওতায় পেট্রোলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানো হয়—তা বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং নিয়ন্ত্রক সুরক্ষাব্যবস্থা দ্বারা সমর্থিত।
এক লিটার ইথানল উৎপাদনে ১০,০০০ লিটার জল খরচ হয়—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে মন্ত্রক জানিয়েছে যে, শুধুমাত্র উদ্বৃত্ত চাল (যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার চাহিদা মেটানোর পর অবশিষ্ট থাকে) ইথানল উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। মন্ত্রক আরও জানায়, ইথানল ডিস্টিলারিগুলোতে প্রতি লিটার ইথানল উৎপাদনে প্রায় ৩-৫ লিটার প্রক্রিয়াজাত জল ব্যবহৃত হয় এবং জল পুনর্ব্যবহারের জন্য ক্রমশ 'জিরো লিকুইড ডিসচার্জ' (কোনও তরল বর্জ্য বাইরে না ফেলা) ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
মন্ত্রক উল্লেখ করেছে যে ভুট্টা—যা বর্তমানে এই কর্মসূচির আওতায় সরবরাহকৃত ইথানলের ৪০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয়—তা চাষে ধানের তুলনায় অনেক কম সেচের প্রয়োজন হয় এবং উচ্চতর 'ন্যূনতম সহায়ক মূল্য' (MSP)-এর মাধ্যমে এর চাষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সরকার E20-কে একটি 'অপরীক্ষিত' জ্বালানি হিসেবে অভিহিত করার দাবিও খারিজ করে দিয়েছে সরকার। তারা উল্লেখ করেছে যে, আন্তর্জাতিকভাবে কয়েক দশক ধরেই ইথানল-মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। উদাহরণস্বরূপ তারা আমেরিকা, ব্রাজিল, কানাডা, থাইল্যান্ড, জাপান এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের কথা উল্লেখ করেছে, যারা বিভিন্ন মাত্রায় ইথানল ব্লেন্ডিং পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।
গাড়ির কার্যক্ষমতা বা পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে মন্ত্রক জানিয়েছে, 'অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া' (ARAI)-এর নেতৃত্বে যাত্রীবাহী গাড়িতে প্রায় ৪০,০০০ কিলোমিটার এবং দু-চাকার গাড়িতে ২০,০০০ কিলোমিটার পথ চালিয়ে যে পরীক্ষা চালানো হয়েছে, তাতে গাড়ি চালানো বা জ্বালানি দক্ষতার ওপর কোনও উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পাওয়া যায়নি। মাইলেজের ক্ষেত্রেও কেবল সামান্য পরিবর্তন দেখা গেছে। মন্ত্রক আরও যোগ করেছে যে, E20-এর জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত বা 'ক্যালিব্রেট' করা গাড়িগুলো ইথানলের উচ্চতর অকটেন রেটিংয়ের সুবিধা পেতে পারে।
E20-এর কারণে ইঞ্জিনের ক্ষতি বা যন্ত্রাংশের ক্ষয় হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রক ARAI-এর পরিচালিত গবেষণার কথা উল্লেখ করেছে। এই গবেষণাগুলো 'ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন', 'ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পেট্রোলিয়াম' এবং 'সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স'-এর সহযোগিতায় করা হয়েছিল।
গবেষণায় গাড়ি চালানো বা ধাতু ও প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশের সামঞ্জস্যের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা পাওয়া যায়নি। তবে পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে রাবারের তৈরি কিছু যন্ত্রাংশ হয়তো নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। মন্ত্রক সেই দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে যে E20 জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গাড়ির ওয়ারেন্টি বা বিমা সুবিধা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তারা জানিয়েছে যে গাড়ি নির্মাতা ও বিমা কোম্পানিগুলো স্পষ্ট করেছে যে, E20-এর জন্য বিশেষভাবে তৈরি বা অনুমোদিত গাড়িগুলো প্রচলিত ওয়ারেন্টি ও বিমা শর্তের আওতাভুক্তই থাকবে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হয়েছিল যে E20 জ্বালানিতে চিনি থাকায় তা পিঁপড়ে ও মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে। এনিয়ে মন্ত্রক জানিয়েছে, জ্বালানি-গ্রেডের ইথানল তৈরির সময় পাতন প্রক্রিয়ায় অবশিষ্ট চিনি দূর করা হয় এবং এতে এমন কিছু উপাদান (ডিনেচার্যান্ট) মেশানো থাকে যা পোকামাকড়কে দূরে রাখে। এছাড়া, মিশ্রিত জ্বালানিতে পেট্রোলের হাইড্রোকার্বন-জনিত গন্ধই প্রধান হয়ে থাকে।
মন্ত্রক সেই দাবিও নাকচ করে দিয়েছে যে E20 ব্যবহারের ফলে গাড়ির জ্বালানি ট্যাঙ্কে জল ঢুকতে পারে। তারা জানিয়েছে যে আধুনিক গাড়ি এবং জ্বালানি সরবরাহ লাইনে জল প্রবেশ রোধ করার মতো প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। একইভাবে, পেট্রোলের সঙ্গে আখের রস মেশানো হচ্ছে বলে দাবি করা ভাইরাল ভিডিওগুলোকে তারা ভুয়ো বলে অভিহিত করেছে। তারা জানিয়েছে যে জ্বালানি ইথানল শিল্প প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত হয় এবং নির্ধারিত গুণমান অনুযায়ী তা মিশ্রিত করা হয়।
পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয়ে সরকার জানিয়েছে যে, ইথানল প্ল্যান্টগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ জল সংক্রান্ত বিধিমালা মেনে চলা আবশ্যক এবং সেগুলোতে 'জিরো লিকুইড ডিসচার্জ' (কোনও তরল বর্জ্য বাইরে না ফেলা) ব্যবস্থা চালু রাখা বাধ্যতামূলক। তারা আরও জানিয়েছে যে, ২০১৪-১৫ সাল থেকে এই কর্মসূচির ফলে ১.৯ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে, কৃষকদের ১.৬ লক্ষ কোটি টাকার বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ৯৩০ লক্ষ মেট্রিক টন হ্রাস পেয়েছে এবং ৩১০ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমানো সম্ভব হয়েছে।
মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ সালে ইথানল মিশ্রণের হার যেখানে মাত্র ১.৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তা বৃদ্ধি পেয়ে ভারত নির্ধারিত সময়ের আগেই—২০২৫ সালের ডিসেম্বরে—পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। বর্তমানে ইথানল উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২,০০০ কোটি লিটারে পৌঁছেছে এবং ২০২৫-২৬ ইথানল সরবরাহ বছরে সংগ্রহের পরিমাণ ১,২০০ কোটি লিটার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।