
দেখতে সুন্দর, বছরে ৬ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। কাগজকল, কাঠের ব্যবসা এবং দ্রুত আর্থিক লাভের আশায় গত কয়েক দশকে আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা, ভারত—বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক হারে লাগানো হয়েছে ইউক্যালিপটাস। মূলত অস্ট্রেলিয়ার এই গাছ এখন বিশ্বজুড়ে ২ কোটি হেক্টরেরও বেশি জমিতে ছড়িয়ে রয়েছে। তবে এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে পরিবেশগত নানা আশঙ্কা। পরিবেশবিদদের একাংশ ইউক্যালিপটাসের একক প্রজাতির বিশাল বাগানকে ‘সবুজ মরুভূমি’ বলেও অভিহিত করেন।
ভারতের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে কেরল ও কর্ণাটকের গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্যালিপটাসের ব্যাপক চাষ নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। এবার ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, পর্তুগাল এবং ভারত—এই চার দেশে পরিচালিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইউক্যালিপটাস চাষের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, পূর্ণবয়স্ক ইউক্যালিপটাস গাছ প্রচুর পরিমাণে জল শোষণ করে। অনেক দেশেই বড় আকারের ইউক্যালিপটাস বাগানের কারণে স্থানীয় জলসম্পদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর গভীর ও বিস্তৃত শিকড় মাটির নিচের জলও ব্যবহার করে।
ফলে ইউক্যালিপটাসের ব্যাপক চাষের এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপ এবং ভারতের কর্ণাটকের মাইসুরু-সহ বেশ কিছু এলাকায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদেরা। এর প্রভাব পড়তে পারে পাশের কৃষিজমি, পুকুর ও কুয়োর উপরেও।
ইউক্যালিপটাসের পাতায় থাকা কিছু রাসায়নিক যৌগ অন্য উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অ্যালেলোপ্যাথি। ফলে ঘন ইউক্যালিপটাস বাগানের নিচে স্থানীয় ঘাস, লতাপাতা বা অন্য উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপর। দেশীয় বনাঞ্চলের তুলনায় একক প্রজাতির ইউক্যালিপটাস বাগানে পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি এবং অন্যান্য প্রাণীর জন্য খাবার ও আশ্রয়ের বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে। ব্রাজিলের আটলান্টিক ফরেস্ট এবং ভারতের পশ্চিমঘাট এলাকায় ইউক্যালিপটাস চাষের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই গবেষণা হয়েছে।
দ্রুত বেড়ে ওঠার কারণে ইউক্যালিপটাস মাটি থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জল ও পুষ্টি গ্রহণ করে। দীর্ঘদিন একই জমিতে ইউক্যালিপটাসের একক চাষ চললে মাটির পুষ্টির ভারসাম্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এছাড়া ইউক্যালিপটাসের পাতা ও অন্যান্য জৈব পদার্থের পচনপ্রক্রিয়া স্থানীয় পরিবেশ ও মাটির বৈশিষ্ট্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ইউক্যালিপটাস বাগান সরিয়ে অন্য ফসল বা দেশীয় গাছ লাগানোর আগে জমির পুনরুদ্ধারে সময় লাগতে পারে।
ইউক্যালিপটাস পাতায় থাকা উদ্বায়ী তেল অত্যন্ত দাহ্য। গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ইউক্যালিপটাস-প্রধান এলাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ রয়েছে।
পর্তুগাল ও অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহ দাবানলের পর ইউক্যালিপটাস বনাঞ্চল নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তবে কোনও নির্দিষ্ট দাবানলের জন্য শুধুমাত্র ইউক্যালিপটাসকেই দায়ী করা যায় না—আবহাওয়া, তাপমাত্রা, খরা, বাতাস এবং মানুষের কর্মকাণ্ডও আগুন ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
ভারতের কেরল, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ইউক্যালিপটাসের বাণিজ্যিক চাষ এবং বন দফতরের লাগানো ইউক্যালিপটাস বাগান নিয়ে পরিবেশবিদদের একাংশ আপত্তি জানিয়েছেন।
কেরলে বনাঞ্চলে ইউক্যালিপটাসের মতো বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানো নিয়েও নীতিগতভাবে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশবিদদের বক্তব্য, দ্রুত আর্থিক লাভের কথা মাথায় রেখে বিদেশি প্রজাতির একক চাষের বদলে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো উচিত।