
কয়েক দশক ধরে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে ইসরো (ISRO)। তারাই রকেটের নকশা তৈরি, নির্মাণ, সংযোজন, পরীক্ষা ও উৎক্ষেপণ—সবকিছু সম্পন্ন করে পরবর্তী রকেটের নকশা তৈরির কাজে হাত দিত। তবে এবার তারা জানিয়েছে, রকেট তৈরির মতো 'নিত্যনৈমিত্তিক' কাজ থেকে তারা সরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিবর্তনের লক্ষ্য হল গবেষণা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও মহাকাশ অভিযানের আরও 'উদ্ভাবনী' ক্ষেত্রগুলোতে সংস্থাটিকে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দেওয়া। ‘বিজনেস টুডে সামিট’-এ ‘ইন-স্পেস’ (IN-SPACe)-এর চেয়ারম্যান পবন গোয়েঙ্কার মন্তব্যের পর এই বিতর্ক জোরদার হয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ভবিষ্যতে ইসরো আর কোনও উৎক্ষেপণ যান (লঞ্চ ভেহিকেল) তৈরি করবে না। বরং সেই কাজের দায়িত্ব বেসরকারি কোম্পানি এবং সরকারি খাতের অন্যান্য সংস্থার হাতে চলে যাবে। তাঁর এই বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বিরোধী দলগুলি প্রশ্ন তুলেছে যে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ইসরোর ভূমিকা কমিয়ে আনছে কি না। পাশাপাশি, ইসরোর কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী নয়টি সংগঠন সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পর্কে ইসরোর চেয়ারম্যান ও ‘ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেস’-এর সচিব ড. ভি. নারায়ণনের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে। তাদের এই উদ্বেগ অমূলক নয়। সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে যে, উৎপাদন ও পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের ফলে ইসরোর কর্মী বাহিনী, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং সংস্থার মূল সক্ষমতার উপর কী প্রভাব পড়বে। তারা সরকারের নীতি, সময়সীমা এবং এই সংস্থার ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা চেয়েছে। বিরোধী দলগুলিও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। তাদের যুক্তি হল যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ইসরোর সক্ষমতা অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। এটি অবশ্যই রাজনীতির অংশ। তবে ছয় দশক ধরে জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা যখন আমূল পরিবর্তনের পথে, তখন এমন প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত যৌক্তিক।
প্রশ্ন অনেক, উত্তর লুকিয়ে ভবিষ্যতের গভীরে। ভারত যখন একেবারে শূন্য থেকে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তুলছিল, তখন এই কর্মপদ্ধতিটি চমৎকারভাবে কাজ করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে ভারতের সামনে প্রশ্নটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশ যদি দ্রুত মানববাহী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জন করে একটি প্রধান মহাকাশ শক্তিতে পরিণত হতে চায়, তবে কি একই সংস্থা সব কাজ চালিয়ে যেতে পারবে? এর উত্তর সম্ভবত ‘না’। ইসরোকে এখন বেসরকারি খাতের বৃহত্তর অংশগ্রহণ মেনে নিতে হবে। বস্তুত, ভারত যদি মহাকাশচারী পাঠানো, ‘ভারতীয় মহাকাশ স্টেশন’ (Bharatiya Antariksh Station) নির্মাণ, চাঁদে মানুষ পাঠানো এবং গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণার বিষয়ে মনোযোগ দিতে চায়, তবে রকেট বা মহাকাশযানের মতো নিয়মিত সরঞ্জাম তৈরির কাজ থেকে সরে আসা ছাড়া ইসরোর সামনে খুব একটা বিকল্প থাকবে না। তবে এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা সতর্কতা রয়েছে। বেসরকারিকরণ মানেই কোনও অজানা পথে ঝাঁপ দেওয়া হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ)। আর ঠিক এই জায়গাতেই বর্তমান বিতর্কটি একটি গুরুতর সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সুতরাং, সমস্যাটি সংস্কারের অভিমুখ বা দিক নিয়ে নয়। বরং সমস্যাটি হল সেই সংস্কারের চূড়ান্ত গন্তব্য বা ফলাফল নিয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বলা যায়, ইসরো (ISRO) অনন্তকাল ধরে সবকিছু একা সামলাতে পারবে না। ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এতটাই বিশাল হয়ে উঠছে যে, তা কোনও একটি একক সংস্থার পক্ষে একা পরিচালনা করা কঠিন। দেশটি ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি মহাকাশ স্টেশন পরিচালনা, ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষবাহী অভিযান, অত্যাধুনিক প্রজন্মের উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা (launch systems) তৈরি এবং চাঁদ ও অন্যান্য গ্রহে ধারাবাহিক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এসব অভিযানের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈজ্ঞানিক, প্রকৌশলগত ও আর্থিক সম্পদের প্রয়োজন। ISRO স্পষ্ট জানিয়েছে, সংস্থার বেসরকারিকরণ হচ্ছে না এবং তার গুরুত্ব কমানো হচ্ছে না। বরং ISRO-র কাজের ধরন বদলাবে।
একটি রকেটের নকশা তৈরি এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এক জিনিস, আর সেই একই রকেট বারবার কারখানায় তৈরি করা অন্য জিনিস। ISRO বলছে, পরিণত প্রযুক্তির রকেট শিল্প সংস্থাগুলি বড় সংখ্যায় তৈরি করলে ISRO-র বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের সময় মুক্ত হবে। তাঁরা তখন Gaganyaan, নতুন প্রজন্মের লঞ্চ ভেহিকল, গভীর মহাকাশ অভিযান, গ্রহ অভিযান এবং অন্যান্য frontier technology নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
ISRO চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন সম্প্রতি বলেছেন, ভারতের বছরে প্রায় ৫০টি launch vehicle-এর প্রয়োজন হতে পারে। এত বড় সংখ্যায় রকেট তৈরি ও উৎক্ষেপণ করতে হলে শুধু ISRO-র নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা যথেষ্ট হবে না। সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি শিল্পকে মিলিয়ে একটি বড় space ecosystem তৈরি করতে হবে।
এটি হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। ISRO-র launch mission-এর প্রায় ৯০% components ও systems দেশীয় শিল্প থেকেই আসে। PSLV উৎপাদনের ক্ষেত্রেও HAL ও L&T-র consortium ইতিমধ্যে পাঁচটি PSLV তৈরির কাজ করছে।
অর্থাৎ, ISRO রকেটের technology তৈরি করবে → industry সেই technology-কে বড় আকারে উৎপাদন করবে—এই মডেলের দিকে ভারত এগোচ্ছে। সরকারের ২০২৩ সালের Space Policy-র দিকনির্দেশনাও মূলত এটাই—ISRO ধীরে ধীরে mature technology-র routine production থেকে সরে গিয়ে advanced R&D-তে বেশি মন দেবে।
এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হল একদিকে ISRO-কে আরও advanced mission-এর জন্য প্রস্তুত করা, অন্যদিকে ভারতের space industry-কে বড় করা। ইতিমধ্যে ২০২০ সালের সংস্কারের পর ভারতে ৪৫০-র বেশি space startup তৈরি হয়েছে বলে ISRO জানিয়েছে।
একটি সরকারি মহাকাশ সংস্থা কীভাবে শক্তিশালী বেসরকারি সেক্টরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে, নাসা তার সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (low-Earth orbit) বিভিন্ন অভিযানের ক্ষেত্রে নাসা ক্রমশ বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের উপর নির্ভর করছে। 'কমার্শিয়াল ক্রু' (Commercial Crew)-এর মতো কর্মসূচির মাধ্যমে সংস্থাটি স্পেসএক্স (SpaceX)-এর মতো বেসরকারি কোম্পানি থেকে পরিষেবা নিচ্ছে। এর ফলে তাদের আর প্রতিটি ব্যবস্থা নিজে মালিকানায় রাখা বা পরিচালনা করার প্রয়োজন পড়ে না—যে কাজগুলো সরকারের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। নাসার মতে, এই পদ্ধতির ফলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো দায়িত্ব পালন করতে পারে। আর এতে সংস্থাটি তার সম্পদ ও মনোযোগ চাঁদ এবং পরবর্তীতে মঙ্গল গ্রহের মতো গভীর মহাকাশ অভিযানের (deep-space missions) উপর রাখার সুযোগ পায়। এছাড়া, 'কমার্শিয়াল লুনার পেলোড সার্ভিসেস' কর্মসূচির আওতায় চাঁদে বিভিন্ন সরঞ্জাম বা 'পেলোড' পাঠানোর জন্যও নাসা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সহায়তা নিচ্ছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণের জন্য তারা একাধিক পথ খুলে দিয়েছে। আর বেসরকারি সেক্টর শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণে নাসার গুরুত্ব কমে যায়নি, বরং তাদের ভূমিকার ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। নাসা এখন মূলত বড় লক্ষ্য নির্ধারণ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়ন, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গবেষণায় ফান্ডিং এবং মানবজাতিকে নতুন দিগন্তের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার কাজগুলো করছে। অন্যদিকে, বেসরকারি সেক্টর বাকি কাজগুলিকে এই সংস্থাকে সাহায্য করছে। বদলে তারা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। চাকরির বাজার খুলছে।
ISRO কি সত্যিই রকেট তৈরি বন্ধ করে দিচ্ছে?
না। ISRO পুরোপুরি রকেট তৈরি বন্ধ করছে না। মূল লক্ষ্য হল পরিণত ও নিয়মিত প্রযুক্তির রকেটের routine production ধীরে ধীরে শিল্প সংস্থার হাতে দেওয়া এবং ISRO-কে গবেষণা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
তাহলে ভবিষ্যতে রকেট তৈরি করবে কারা?
বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা এবং সরকারি খাতের অন্যান্য সংস্থা বড় সংখ্যায় রকেট তৈরির দায়িত্ব নিতে পারে। ISRO মূলত প্রযুক্তি, নকশা, উন্নয়ন ও নতুন প্রজন্মের উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করবে।
ISRO কেন রকেট উৎপাদনের দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থাকে দিতে চাইছে?
রকেটের একই মডেল বারবার তৈরি করা মূলত একটি উৎপাদনমূলক কাজ। এই দায়িত্ব শিল্প সংস্থাগুলি নিলে ISRO-র বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা Gaganyaan, চন্দ্র অভিযান, গভীর মহাকাশ গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে বেশি সময় দিতে পারবেন।
ভারতে বছরে কতগুলি রকেট উৎক্ষেপণের প্রয়োজন হতে পারে?
ISRO চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ভারতের বছরে প্রায় ৫০টি উৎক্ষেপণ যান প্রয়োজন হতে পারে। এত বড় সংখ্যায় উৎপাদনের জন্য সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
ISRO-র এই পরিবর্তনে ভারতের কী লাভ হতে পারে?
রকেট উৎপাদনের পরিমাণ বাড়তে পারে, উৎক্ষেপণের খরচ কমতে পারে এবং launch capacity বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি মহাকাশ শিল্পে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
ভারতের মহাকাশ স্টেশন তৈরির সঙ্গে এই পরিবর্তনের কী সম্পর্ক?
ভারতের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে Bharatiya Antariksh Station পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করা। পাশাপাশি ২০৪০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। এই ধরনের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির জন্য ISRO-কে গবেষণা ও মিশন-কেন্দ্রিক কাজে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।