
প্রবল বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরাখণ্ড। ভারী বৃষ্টির জেরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভূমিধস, বাড়ি ধসে পড়া এবং আকস্মিক বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখনও পর্যন্ত অন্তত সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। প্রবল বর্ষণে দেরাদুন-মুসুরি জাতীয়সড়কেও যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। মুসুরির কাছে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বিভিন্ন অংশে পাথর পড়া, রাস্তা বসে যাওয়া এবং বার বার ধস নামায় পথ কোথাও বন্ধ, কোথাও আবার সরু হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে আলমোড়া ও দেরাদুনে। আলমোড়ায় পৃথক ঘটনায় দেওয়াল ধসে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্য দিকে, দেরাদুনে প্রবল জলের স্রোতে একটি গাড়ি ভেসে গিয়ে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কয়েকটি জেলায় স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকেও।
আলমোড়ার হাভালবাগ ব্লকের ওদিউদা গ্রামে ভোর ৩টে নাগাদ একটি বাড়ির দেওয়াল ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন প্রেমা দেবী (৪২), কল্পনা আর্য (১৯) এবং মণীশ কুমার (১৮)। বাড়ির বাইরে একটি ঘরে ঘুমোনোর কারণে গোলাপ রাম অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল। উদ্ধারকারী দলের সদস্যেরা স্থানীয় বাসিন্দা, দমকল এবং জেলা পুলিশের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালান। সেখান থেকেই তিনজনের দেহ উদ্ধার করা হয়। পরে দেহগুলি জেলা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
আলমোড়া শহরের ধারকিটুনি এলাকাতেও একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে একটি পুরনো বাড়ির দেওয়াল ধসে দুই নেপালি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১১টা ৩৬ মিনিটে জেলা কন্ট্রোল রুমে খবর পৌঁছয়। এসডিআরএফের সদস্যেরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দু’জনকে উদ্ধার করলেও ততক্ষণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল। মৃত দু’জনের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে বলে মনে করা হচ্ছে। সোমবার রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টির জেরে আলমোড়ায় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত পাঁচ হয়েছে।
দেরাদুনের প্রেম নগর থানা এলাকার লোয়ার কানডোলিতে পাউন্ডা রোডের কানডোলি সেতুর কাছে সোমবার গভীর রাতে প্রবল জলের স্রোতে একটি গাড়ি ভেসে যায়। গাড়িতে দুই মহিলা এবং এক পুরুষ ছিলেন। খবর পেয়ে ডাকপাথরের এসডিআরএফ দল, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর সুরেশ তোমরের নেতৃত্বে, উদ্ধারকাজ শুরু করে। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং প্রবল স্রোতের মধ্যেও সারা রাত অভিযান চালানো হয়। তল্লাশির সময় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে আহত অবস্থায় এক মহিলাকে উদ্ধার করা হয়। তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জয়পুরের বাসিন্দা ২০ বছরের অক্ষয় এবং অপর এক মহিলার দেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁদের দেহও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
ভারী বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির মধ্যে রয়েছে দেরাদুন-মুসুরি জাতীসড়ক। ‘পানি ওয়ালা বেন্ড’ এলাকায় ধস ও পাথরের স্তূপের কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টির জেরে রাজ্যের বিভিন্ন নদী ও জলধারার জলস্তরও বেড়েছে। ঋষিকেশে ‘বিন’ নদী উপচে জল আগে থেকেই প্লাবিত একটি কজওয়ের উপর দিয়ে বইতে শুরু করে। হালদোয়ানিতেও গৌলা নদীর জলস্তর বেড়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হালদোয়ানিতে ১৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
নৈনিতালে মল রোডও নর্দমার জলে প্লাবিত হয়। রামনগরে সোমবার সন্ধ্যার পর ভারী বৃষ্টিতে রামনগর-হালদোয়ানি রাজ্য সড়কের বেলগড় নালায় আচমকা জলের স্তর বেড়ে যায়। এর জেরে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাস্তার দু’দিকে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। বহু গাড়ি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। রামনগরে একটি তিন চাকার গাড়িও প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে উপচে পড়া একটি জলধারার দিকে চলে যাচ্ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা সেটিকে টেনে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসেন।
অবিরাম বৃষ্টির জেরে আবহাওয়া দফতর (IMD) সতর্কতা জারি করেছে। নৈনিতাল ও আলমোড়ায় রেড অ্যালার্ট, আর রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি রয়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নৈনিতাল, আলমোড়া এবং বাগেশ্বর জেলায় প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাগেশ্বরের সমস্ত স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয়েছে। বাগেশ্বরের জেলাশাসক অপূর্ব পাণ্ডে জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভূমিধস এবং উপর থেকে পাথর পড়ার খবর এসেছে। পরিস্থিতির উপর প্রশাসন কড়া নজর রাখছে। বাসিন্দাদের নদী, নালা, জলধারা এবং ধসপ্রবণ এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনকে জানানোর আবেদন করা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকেও প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধারকাজের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।