
হায়দরাবাদের এক মহিলা তাঁর স্বামী নওয়াজ (ওরফে নবদুর্গা) এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা, ধর্ষণ এবং ব্ল্যাকমেল করার মতো মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন। সংবাদ সংস্থা ANI-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতারণা, শারীরিক অত্যাচার, আর্থিক শোষণ এবং ধর্মীয় জবরদস্তির এক ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেছেন।
নির্যাতিতা জানান, অভিযুক্ত নওয়াজের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয় যখন সে একটি দোকান ভাড়া নিতে আসে। মহিলার অভিযোগ, তাঁর বিশ্বাস অর্জনের জন্য নওয়াজ মিথ্যে দাবি করে যে সে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে এবং নিজের নাম বদলে নবদুর্গা রেখেছে। ANI-কে ওই মহিলা বলেন, “২০২১ সালের মে মাসে নওয়াজের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। দু-এক দিন দেখা হওয়ার পরেই সে আমাকে বলে যে সে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং তার নাম এখন নবদুর্গা। সেই সময় ওর পরিবারের যারা উপস্থিত ছিল, সবাই এই কথায় সায় দেয়। আসলে NoBroker-এ আমি আমাদের দোকান ভাড়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। ১৭ই মে আমি বিজ্ঞাপন দিই আর ১৮ই মে সে আমাদের দোকানে আসে। এসেই এক মাসের ভাড়া আর ডিপোজিট দিয়ে দেয়। এভাবেই ওর সঙ্গে আমার আলাপ। গত বছর ২৮শে জুলাই আমি ওকে বিয়ে করি। বিয়ের আগে ওরা বলেছিল যে সে হিন্দু হয়ে গেছে, কিন্তু বিয়ের পর ওরাই আমাকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে।”
মহিলার অভিযোগ, নওয়াজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করানোর নাম করে তাঁকে একটি রিসর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, সেখানে তাঁকে জুস বা খাবারের সঙ্গে মাদক মিশিয়ে খাওয়ানো হয় এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়। এরপর নওয়াজ তাঁর আপত্তিকর ছবি তুলে সেই ছবি দেখিয়ে তাঁকে বিয়ে করার জন্য ব্ল্যাকমেল করে। নির্যাতিতা বলেন, "মে মাসের ২৪ তারিখে ও আমাকে একটা রিসর্টে নিয়ে যায়। বলেছিল ওর পরিবারের লোকজন সেখানে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসবে। এর আগে ওর ভাই-বোনেরা ভিডিও কলে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল এবং জানিয়েছিল যে তারা হায়দরাবাদ আসছে। আমরা সবাই একসঙ্গে রিসর্টে যাব। ২৪ তারিখে আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। কিন্তু নওয়াজ বলে যে ওর পরিবারের আসতে দেরি হচ্ছে। ও আমাকে আগে রিসর্টে পৌঁছে যেতে বলে, ওরা নাকি পরে আসবে। রিসর্টে পৌঁছনোর পরেও আমি অপেক্ষা করতে থাকি। ও বারবার বলতে থাকে যে ওরা পথেই আছে। ও আমার জন্য লাঞ্চ আর ড্রিঙ্কস নিয়ে আসে, কিন্তু আমি বলি যে সবাই একসঙ্গে খাব। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ও আবার খাবার আর জুস নিয়ে এসে আমাকে জোর করে খাওয়ায়। তার কিছুক্ষণ পরেই আমি জ্ঞান হারাই।"
নির্যাতিতার অভিযোগ, তাঁকে দিয়ে জোর করে ১৬.৭ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করানো হয় এবং তাঁর উপর শারীরিক নির্যাতন ও হুমকি দেওয়া হয়। আবেগ দিয়ে ব্ল্যাকমেল, হুমকি এবং ভয় দেখিয়ে তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। ২০২১ সালের জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে অভিযুক্ত এবং তার পরিবার তাঁর থেকে প্রায় ১৬.৭ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়, তাঁর নামে লোন নেয়, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে এবং শামশাবাদে তাঁর জমি সঠিক অনুমতি ছাড়াই বিক্রি করে দেয়। সব মিলিয়ে তাঁর অনুমান, প্রায় ২৫-৩০ লক্ষ টাকা এবং প্রচুর সোনা খুইয়েছেন তিনি। “পরদিন সকাল ১১টায় যখন আমার জ্ঞান ফেরে, তখন শরীরজুড়ে প্রচণ্ড ব্যথা। আমি রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি নওয়াজের নামে বা তার দলের আর কারও নামে অন্য কোনও ঘর বুক করা হয়েছে কিনা। রিসেপশনিস্ট জানান, মাত্র একটাই ঘর বুক করা হয়েছে। তখনই আমি বুঝতে পারি যে আমাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। ঘরে ফিরলে নওয়াজ সোফায় বসেছিল। আমি কোথায় গিয়েছিলাম জিজ্ঞাসা করায় মিথ্যে বলি যে খাবারের বিল দিতে গিয়েছিলাম। আগের রাতে কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে ও স্বীকার করে, 'তুমি যখন অজ্ঞান ছিলে, আমি তোমার সঙ্গে যা খুশি তাই করেছি।' এরপর ও আমাকে আমার অজ্ঞান অবস্থার কিছু ছবি দেখায়। সেই ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করে বলে, 'তোমাকে আমাকেই বিয়ে করতে হবে, অন্য কাউকে নয়। এই জন্যই আমি এটা করেছি। বিয়ে হয়ে গেলে আমি ছবিগুলো ডিলিট করে দেব।' এরপর ওরা আমাদের জোর করে নিজেদের বাড়ি থেকে বেগমপেটে সরিয়ে দেয়। দুই সপ্তাহ পর আবার কুন্দন বাগে নিয়ে যায়। জুন মাস জুড়ে আরও অনেক ঘটনা ঘটে। আমার নামে ব্যবসা শুরু করার অজুহাতে ওরা আমার থেকে টাকা নেয়। ওর ভাই দাবি করে যে সে একটি 'হাওয়ালা নোট' হারিয়ে ফেলেছে এবং পুরোনো শহরের লোকেরা এসে আমাকে ও আমার পরিবারকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয়। ওরা আমাকে একটা জমির দলিলেও সই করতে চাপ দেয়, বলে যে জমিটা আমার নামেই হবে। জুলাই মাসের মধ্যে ওরা আমার থেকে মোট ১৬.৭ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। জুন মাসে ওর ভাই আর বন্ধুরাও আমার উপর শারীরিক অত্যাচার শুরু করে।”
"ওরা আমাকে ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করত। বলত, বাইরে কিছু বললে এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেবে। এমনকি আমার মা-বোনকে মেরে ফেলার হুমকিও দিত, নাহলে বোনকে কিডন্যাপ করে ধর্ষণ করবে বলত। ওরা বলত, খুন করলে এমনভাবে করবে যাতে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হয়, কেউ সন্দেহও করবে না। এভাবেই ওরা আমাকে হুমকি দিত। পুরো পরিবার, ওর বন্ধুরা সবাই এর মধ্যে জড়িত। নওয়াজ, মুনাওয়ার, শাহরুখ, সোহেল, সমীর। সোহেল আর সমীর আসলে একজনই, কিন্তু ওরা দুজন বলে পরিচয় দিত। সোহেল, সমীর, ইসমাইল, রেশমা, বোন নাসিমা," যোগ করেন তিনি।
নির্যাতিতার অভিযোগ, ২৮শে জুলাই তাঁকে জোর করে নওয়াজকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। বিয়ের পর তাঁকে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়, তাঁর নাম বদলে 'নাজিরা' রাখা হয় এবং নিরামিষাশী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে গরুর মাংস খেতে বাধ্য করা হয়। নির্যাতিতা জানান, তাঁকে ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। তাঁকে মারধর করা, অন্যদের সামনে তাঁর পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া এবং মাদক খাইয়ে দেওয়া হতো। তিনি বিশেষভাবে অভিযোগ করেন যে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে তাঁকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হয়। তিনি বলেন, "বিয়ের আগে ওরা আমাকে শারীরিকভাবে ব্যবহার করেছে। বিয়ের পর একবার আমাকে নেল্লোরে নিয়ে যায়। সেদিন ওর বোন বলছিল যে ওদের ভাষায় নওয়াজ যদি তিনবার 'তালাক' বলে, তাহলেই ডিভোর্স হয়ে যাবে। ডিভোর্সের পর ওই পরিবারের অন্য যে কেউ আমার স্বামী হতে পারে, কারণ আমি এখন মুসলিম। মুসলিমদের মধ্যে নাকি এভাবেই চলে। সেদিন ও আমাকে বলেছিল যে অন্য কিছু লোক এসে আমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু আমার মা বলেন সেদিনই হায়দরাবাদ ফিরে আসতে, নাহলে তিনি শান্তিতে থাকবেন না। মা ওকে এমনটা বলার পর ওর বোন বলছিল যে আমার নাকি অন্য লোকের সঙ্গে থাকা উচিত।"
নির্যাতিতা তাঁর স্বামী এবং তার পরিবারের সদস্য মুনাওয়ার, শাহরুখ, সোহেল, সমীর, ইসমাইল, রেশমা এবং নাসিমাকে এই অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে, অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। নির্যাতিতা দাবি করেন, আগস্ট মাসে তিনি গর্ভবতী ছিলেন এবং তাঁকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হয়। "আগস্ট মাসে ইমাম আমাদের বাড়িতে আসেন এবং তারপর ধর্মান্তরকরণ হয়। আমাকে কলমা পড়তে বলা হয়, কোরানের কিছু আয়াতও পড়তে বলা হয়। ওরা আমার নাম বদলে নাজিরা রাখে। আমাকে গরুর মাংস খেতে বাধ্য করে। আমি নিরামিষাশী। আমি না বলায় ওরা আমাকে মারে। ওরা ঝগড়া করে আমার মাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। পুরো মাসটা আমি অত্যাচারের মধ্যে ছিলাম। ও ওর ভাইদের সামনে আমার পোশাক ছিঁড়ে দিত। আমার সব ডিভাইস, আমার ফোন কেড়ে নিয়েছিল। আগস্টে আমি গর্ভবতী ছিলাম, আর ওরা আমাকে গর্ভপাতের ওষুধ দেয়। ওরা আমাকে খুব মারত। বাড়িতে কোনও পুজো করতে দিত না। ওরা আমার উপর শারীরিক অত্যাচার করত। আমার খাবারে কিছু মিশিয়ে দিত, আর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম," তিনি অভিযোগ করেন।
আর্থিক শোষণের অভিযোগ
তিনি অভিযোগ করেন যে তাঁর স্বামী এবং তার পরিবারের সদস্যরা তাঁর নামে লোন নেয় এবং তাঁর অনুমতি ছাড়াই শামশাবাদে তাঁর জমি বিক্রি করে দেয়। তিনি বলেন, “ওরা ২৫-৩০ লক্ষ টাকা নিয়েছে। জানুয়ারি মাসে ও বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ও বলত দুবাইতে থাকা কিছু বড় মাথা নাকি আমাদের মেরে ফেলবে, আমাদের খুঁজছে, তাই আমাদের লুকিয়ে থাকতে হবে। ওরা দুটো বা তিনটে লোন নেয়। আমার ক্রেডিট কার্ড, আমার ৪-৫ লক্ষ টাকার সঞ্চয় সব নিয়ে নেয়। শামশাবাদে আমার জমি বিক্রি করে দেয়। আমার মাকে ৪ লক্ষ টাকা দেয়। আমাদের কাছে কোনও কাগজপত্র ছিল না। ওরা বলে, আইনি কাগজপত্রের জন্য টাকা লাগছে। বাকি টাকা নাকি ব্যবসার জন্য নিয়েছে। প্রায় ৯ তোলা সোনা, যা এখনও মুথুট-এ আছে, একটা হাওয়ালা নোটের জন্য টাকা নেয়। বিয়ের জন্য আমার মা সোনার আংটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। ওরা আমার সোনার আংটি, আমার গয়না, প্রায় ১২-১৩ তোলা সোনা নিয়ে নিয়েছে।”
নির্যাতিতার অভিযোগ, জানুয়ারি মাসে পুলিশের কাছে গেলেও কর্তৃপক্ষ প্রতারণা বা ধর্ষণের মামলা না নিয়ে একটি 'নিখোঁজ' মামলা দায়ের করে। তিনি দাবি করেন, অভিযুক্তরা স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে, যার ফলে সঠিক তদন্ত হচ্ছে না। নির্যাতিতা দাবি করেন যে তিনি ১৬ই জানুয়ারি পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন, কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। "আমি যখন প্রতারণার মামলা করতে যাই, ওরা নিখোঁজ ডায়েরি নেয়। যে ব্যক্তি আমাকে ধর্ষণ করেছে, সে পুলিশ স্টেশনে এসে এসআই এবং সিআই-এর সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলে। কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না," তিনি অভিযোগ করেন। (ANI)