
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে (UNGA) আনা একটি প্রস্তাবে ভোট দিল ভারত। এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হল, বিশ্বের মানচিত্রকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে দেখানোর জন্য 'equal-area' বা সমান ক্ষেত্রফলযুক্ত প্রজেকশন ব্যবহার করা। তবে ভারত এই প্রস্তাবকে সমর্থন করার পাশাপাশি নিজেদের অবস্থানও দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে। নয়াদিল্লির সাফ কথা, জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দুটিকে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ীই দেখাতে হবে।
এই বিষয়ে মিডিয়ার প্রশ্নের উত্তরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, কেন ভারত এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে এবং এর মূল বিষয়বস্তু কী। জয়সওয়াল স্পষ্ট করে দেন যে, প্রযুক্তিগতভাবে সমান ক্ষেত্রফলযুক্ত মানচিত্রকে সমর্থন করার অর্থ এই নয় যে, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে উপেক্ষা করা হবে।
তিনি বলেন, “ভারত এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে এবং কেন দিয়েছে, তার ব্যাখ্যাও জমা দিয়েছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হল সমান ক্ষেত্রফলযুক্ত মানচিত্রের ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া। আমরা এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছি যে, এই প্রস্তাব কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র বা দেশের সীমানাকে স্বীকৃতি দেয় না। জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ সহ ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ডকে দেশের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ীই দেখাতে হবে। কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর চিত্রণ গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা নিয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট এবং এ নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।”
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে এই প্রস্তাবটি পাশ হয় ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। প্রস্তাবটির নাম “Correct the Map: Rebalancing Global Cartographic Representation and Promoting Equitable Representation of the World’s Regions, Particularly Africa”।
এই প্রস্তাবটি মূলত আফ্রিকার দেশগুলির নেতৃত্বে আনা একটি প্রচারণার ফল। তাদের দাবি, ১৬ শতকের পুরনো ‘মার্কেটর প্রজেকশন’ (Mercator projection) মানচিত্রের ব্যবহার বন্ধ হোক। কারণ এই মানচিত্রে মেরুর কাছাকাছি থাকা দেশগুলিকে অনেক বড় করে দেখানো হয়, আর বিষুবরেখার কাছের দেশ, যেমন আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকাকে অনেক ছোট দেখায়।
জয়সওয়াল আরও যোগ করেন, “এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য হল সমান ক্ষেত্রফলযুক্ত মানচিত্রের ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া। এটি কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ব মানচিত্রকে স্বীকৃতি দেয় না বা রাজনৈতিক মানচিত্র, যেমন আন্তর্জাতিক সীমানা, বিতর্কিত অঞ্চল বা জায়গার নাম নিয়ে আলোচনা করে না।”
এই প্রস্তাব পুরনো মানচিত্র নিষিদ্ধ করছে না বা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিকল্প চাপিয়ে দিচ্ছে না। বরং রাষ্ট্রসংঘ সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে ‘ইক্যুয়াল আর্থ প্রজেকশন’-এর (Equal Earth projection) মতো বিকল্প ব্যবহার করতে উৎসাহিত করছে, যেখানে মহাদেশগুলির আপেক্ষিক আয়তন সঠিকভাবে দেখানো হয়।
এই প্রস্তাবটি বিপুল সমর্থনে পাশ হয়েছে। পক্ষে ১৬৪টি ভোট পড়েছে। এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলডোভা, সার্বিয়া এবং ইউক্রেন—এই ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।
এই মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় আফ্রিকার সমান বড় দেখায়। কিন্তু বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়। গ্রিনল্যান্ডের আয়তন প্রায় ২১.৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার, আর আফ্রিকার আয়তন প্রায় ৩০৩.৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার।
একইভাবে, আলাস্কাকে ব্রাজিলের সমান বড় মনে হয়। কিন্তু আসলে ব্রাজিল আলাস্কার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বড়। আলাস্কার আয়তন প্রায় ১৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার, আর ব্রাজিলের প্রায় ৮৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার।
মানচিত্রের নীচে থাকা অ্যান্টার্কটিকাকে বিশাল বড় দেখায়, যেন এটি পৃথিবীর নীচের অংশ জুড়ে রয়েছে। যদিও এটি সত্যিই বড়, কিন্তু এর আকার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বাড়িয়ে দেখানো হয়।