
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জুন মাসের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্জিও গোরের মন্তব্যের পর এবার মুখ খুলল সরকারি সূত্র। সূত্র জানিয়েছে, কোনও উচ্চ-পর্যায়ের বিদেশি সফরের আগে জনসমক্ষে উপস্থিতির ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা একটি 'স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল' বা সাধারণ নিয়ম।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ভিভিআইপি সফরের আগে নেতাদের জনসমক্ষে আসার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা একটি স্বাভাবিক বিষয়। এই ক্ষেত্রেও, ভারতীয় পক্ষ এই ধরনের সফরের জন্য তাদের সাধারণ পদ্ধতি সম্পর্কে জানিয়েছিল।
শনিবার ইকোনমিক টাইমস ওয়ার্ল্ড লিডারস ফোরামে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্জিও গোর দাবি করেন, ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও ট্রাম্পের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর ভারত মার্কিন প্রশাসনকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছিল যাতে মিডিয়ার থেকে কোনও প্রশ্ন না নেওয়া হয়। এই মন্তব্যের পরেই সরকারি স্তরে এই ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
গোর জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে এই অনুরোধে রাজি হলেও, পরে তিনি নিজেই সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ করে দেন। এর ফলে বৈঠকটি প্রধানমন্ত্রী মোদীকে পাশে বসিয়েই প্রায় ৪৫ মিনিটের একটি সাংবাদিক সম্মেলনে পরিণত হয়। এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি ১৭ জুন ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁস-এ জি৭ সম্মেলনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ঘটনার ক্রম মনে করে গোর বলেন যে বৈঠকের আগে ট্রাম্পের সাথে তার একটি ছোট কথোপকথন হয়েছিল। গোর বলেন, "আমরা স্টেজের পিছনে ছিলাম, এবং এক পর্যায়ে শুধু প্রেসিডেন্ট আর আমি ছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ভারতীয়রা কী কী বিষয় তুলবে। আমরা কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করি।"
তিনি আরও বলেন, "ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেন, ওদের কি কোনও অনুরোধ আছে? বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) একটা অনুরোধ ছিল। সেটা হলো, মিডিয়াকে ডাকা হোক, কিন্তু পুরো প্রেস কনফারেন্স যেন না হয়।" গোর জানান যে তিনি ভারতীয় পক্ষের এই ইচ্ছার কথা সরাসরি ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন। গোর বলেন, "আমি প্রেসিডেন্টকে বললাম, ভারতীয়রা প্রশ্ন না হলেই ভালো হয়। তিনি বললেন, ঠিক আছে, কোনও সমস্যা নেই।"
এরপর মিডিয়া কর্মী এবং টেকনিক্যাল ক্রুদের উপস্থিতিতে বৈঠক শুরু হয়। গোর উল্লেখ করেন যে প্রায় ৫০টি ক্যামেরা সেট আপ করা হয়েছিল, যখন মোদী এবং ট্রাম্প তাদের প্রাথমিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য একে অপরের মুখোমুখি বসেন। তিনি বলেন, "বৈঠক শুরু হলো, প্রেস এলো, প্রায় ৫০টা ক্যামেরা ছিল। প্রেসিডেন্ট এখানে বসে, প্রধানমন্ত্রী ওখানে, দুজনেই কয়েক মিনিট কথা বললেন।"
কিন্তু উদ্বোধনী বক্তব্য শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ট্রাম্প উপস্থিত সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, "কোনও প্রশ্ন?" রাষ্ট্রদূত বলেন, "আর এতেই সব কিছু খুলে গেল।" তিনি জানান, বৈঠকটি "৪৫ মিনিটের একটি সাংবাদিক সম্মেলনে" পরিণত হয়েছিল, যেখানে "সবকিছুই আলোচনার টেবিলে ছিল"।
১৭ জুনের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি এমন এক সময়ে হয়েছিল, যার কিছুদিন আগেই হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলায় তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। এই অঞ্চলে চলাচলকারী ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা মোদীর তোলা অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল।
বৈঠকে মোদী ট্রাম্পকে বলেন, "হরমুজ প্রণালীতে অনেক ভারতীয় নাবিক রয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" যদিও ট্রাম্প সামুদ্রিক যাত্রার বিপদকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে এটিকে একটি "কঠিন পেশা" বলে মন্তব্য করেন।
নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন যে, বাইরের কোনও আক্রমণের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সমর্থন করবে। মোদীর দিকে ইশারা করে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, "যদি কেউ ওই লোকটিকে আক্রমণ করে, আমরা পাশে থাকব। কিন্তু নতুন নেতা এলে, আমি নিশ্চিত নই।" দুই নেতা হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি এবং ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেন।
জুন মাসের এই সফরটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটন একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছিল। সেই সময় পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার কারণে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ প্রভাবিত হচ্ছিল। ট্রাম্প সেই বৈঠকে আরও বলেন যে উভয় দেশ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের "খুব কাছাকাছি" চলে এসেছে।