
মার্চ ২০২৬ ভারতের এনার্জি সেক্টরের জন্য এক অদ্ভুত মাস ছিল। সাধারণত রান্নার গ্যাস বা LPG-র ব্যবহার ক্রমাগত বাড়তে থাকে, কিন্তু এই মাসে হঠাৎ করেই তাতে বড়সড় পতন দেখা গেল। পরিসংখ্যান বলছে, এটা শুধু সাধারণ ওঠানামা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব। এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা দুর্বল।
তেল মন্ত্রকের অধীনস্থ পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সেল (PPAC)-এর নতুন তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬-এ দেশে মোট LPG ব্যবহার কমে দাঁড়িয়েছে ২.৩৭৯ মিলিয়ন টনে। গত বছর মার্চে এই পরিমাণ ছিল ২.৭২৯ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ, ব্যবহার কমেছে ১২.৮%। এই পতন এমন একটা সময়ে ঘটল, যখন ভারত তার মোট LPG চাহিদার প্রায় ৬০% আমদানি করে, যার একটা বড় অংশ আসে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে।
আমেরিকা ও ইজরায়েলের ইরানে হামলা এবং তারপর তেহরানের পাল্টা জবাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাপ্লাই রুটের ওপর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে আসা গ্যাস সরবরাহেও বাধা আসে। ফলে, ভারতকে তার অভ্যন্তরীণ বণ্টন ব্যবস্থায় অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়।
সাপ্লাইয়ের চাপ সামলাতে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়-
যদিও সরকার দাবি করছে যে ঘরোয়া গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে, কিন্তু পরিসংখ্যান কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
PPAC-এর তথ্য অনুযায়ী:
এ থেকে পরিষ্কার যে, সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছে হোটেল, শিল্প এবং বড় গ্রাহকদের ওপর।
সাপ্লাইয়ের ঘাটতি মেটাতে সরকার রিফাইনারিগুলোকে পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টককে LPG উৎপাদনে কাজে লাগানোর নির্দেশ দেয়। এর ফলও মিলেছে:
পুরো অর্থবর্ষে (২০২৫-২৬):
মার্চে ব্যবহার কমলেও, পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে LPG-র মোট ব্যবহার ৬% বেড়ে ৩৩.২১২ মিলিয়ন টন হয়েছে। এটি ক্রমবর্ধমান চাহিদারই ইঙ্গিত। এর একটি বড় কারণ হল সরকারের স্বচ্ছ জ্বালানি নীতি, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কাঠ এবং কয়লার বিকল্প হিসেবে LPG-র প্রসার।
বিমান চলাচলে বাধা এবং উড়ান বাতিল হওয়ার কারণে ATF-এর চাহিদা বাড়েনি, যেখানে সড়ক পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে।
এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায় যে কিছু শিল্পে গতি কমলেও, পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ চালু আছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ভারতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
এই সমস্ত কারণগুলি দেখিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি সুরক্ষা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি কৌশলগত বিষয় হয়ে উঠেছে। মার্চ ২০২৬-এ LPG ব্যবহারে পতন শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এটি বিশ্ব রাজনীতি এবং ভারতের জ্বালানি নীতির মধ্যে গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরেছে।
সরকার তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য উৎপাদন বাড়ানো এবং অগ্রাধিকার ঠিক করার মতো পদক্ষেপ নিলেও, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য জ্বালানির উৎসগুলিতে বৈচিত্র্য আনা এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।