
২০৩০ সালের মধ্যে ভারতকে ম্যালেরিয়া মুক্ত করার যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, সেই পথে কতটা অগ্রগতি হলো, তা শুক্রবার খতিয়ে দেখল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক। ন্যাশনাল হেলথ মিশনের (NHM) অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি ও মিশন ডিরেক্টর আরাধনা পট্টনায়েক এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট কৌশল এবং নজরদারি আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মিশন ডিরেক্টর আরাধনা পট্টনায়েকের নেতৃত্বে একটি উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠক হয়। এতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক, ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভেক্টর বোর্ন ডিজিজেস কন্ট্রোল (NCVBDC)-এর শীর্ষ আধিকারিকরা এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও জেলার ন্যাশনাল হেলথ মিশনের মিশন ডিরেক্টর ও জেলাশাসকরা উপস্থিত ছিলেন।
জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রে লাগাতার চেষ্টার ফলে ভারত ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে অনেকটাই সফল হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ও মৃত্যু প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, যে জেলাগুলিতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ খুব বেশি ছিল, তার সংখ্যা ১৫৫ থেকে কমে ৩৩ হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ১৬০টি জেলায় স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়ার কোনো সংক্রমণ ঘটেনি, যা নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণের ফলকেই তুলে ধরে।
বৈঠকে মূলত ৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৩৩টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলার ওপর নজর দেওয়া হয়। কারণ ২০২৫ সালে দেশের মোট ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ৬৪ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৫৪ শতাংশই এই জেলাগুলি থেকে রিপোর্ট করা হয়েছে। মিজোরাম, ওড়িশা, ত্রিপুরা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড এবং মহারাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
পট্টনায়েক বলেন, স্থানীয় ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং রোগের প্রকোপ অনুযায়ী রণকৌশল তৈরি করতে হবে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। তিনি ৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় 'ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকশন প্ল্যান' এবং সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত গ্রামগুলিতে 'ভিলেজ অ্যাকশন প্ল্যান' কার্যকর করার ওপর জোর দেন।
বৈঠকে 'টেস্ট, ট্রিট অ্যান্ড ট্র্যাক' কৌশলের অধীনে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাজ্যগুলিকে সক্রিয় নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে রোগ নির্ণয়ের সুবিধা এবং ম্যালেরিয়ার ওষুধ যাতে সবসময় পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় দেরি হওয়াকেই ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই রাজ্যগুলিকে নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে তথ্যের গুণমান উন্নত করা এবং নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়। রাজ্যগুলিকে অস্বাভাবিক বেশি রক্ত পরীক্ষার হার (Annual Blood Examination Rates) খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে, যাতে একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার নথিভুক্ত না হয় বা উপসর্গহীন ব্যক্তিদের স্ক্রিনিংয়ের তথ্য মূল গণনায় না ঢুকে পড়ে। জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, গণ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে সনাক্ত হওয়া উপসর্গহীন রোগীদের তথ্য আলাদাভাবে রিপোর্ট করতে হবে, যাতে ম্যালেরিয়ার প্রকৃত পরিস্থিতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়।
আরাধনা পট্টনায়েক ম্যালেরিয়া নির্মূলের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শুধুমাত্র স্বাস্থ্য দপ্তরের পদক্ষেপে জলাশয় পরিষ্কার, মশার উৎস ধ্বংস বা পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলি সমাধান করা সম্ভব নয়। রাজ্যগুলিকে গ্রামীণ ও নগরোন্নয়ন দপ্তর এবং পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত খবর দেওয়া, মশার আঁতুড়ঘর চিহ্নিত করা এবং উৎস ধ্বংসের মতো কাজে স্বনির্ভর গোষ্ঠী, স্বেচ্ছাসেবী এবং পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের আরও বেশি করে যুক্ত করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব প্রভাকর, যুগ্ম সচিব (VBD) নিখিল গজরাজ, NCVBDC-র ডিরেক্টর ডঃ তনু জৈন এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য ও জেলার আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন।