
কাজের সময় ধরা বাঁধা। এদিকে অফিসে দেরিতে ঢোকার সময় নির্দিষ্ট থাকলেও অফিস থেকে বেরনোর সময়ের কোনও ঠিক নেই। কখনও ৯ , কখনও ১২ আবার কখনও ১৬ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন কর্মীরা। ভারতে এই ছবিটা অত্যন্ত সাধারণ। বিনা পারিশ্রমিকে ওভার টাইম এই দেশে কোনও নতুন বিষয় নয়। সব কোম্পানিরই একই হাল।
এদিকে অফিস ছুটি কিন্তু মেইল, কলিং,ফোন, রিপোর্টের শেষ নেই। বাড়ি ফিরেও তাই আরও কয়েক ঘণ্টা কাজ করতেই হয় কর্মীদের। বিশ্বে বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে ভারত। এডিপি রিসার্চের ‘পিপল অ্যাট ওয়ার্ক ২০২৬’ শীর্ষক এক রিপোর্টে এমন তথ্যই সামনে এসেছে।
শুধু দীর্ঘ সময় কাজ করাই নয়, অতিরিক্ত কাজের সময়ের হিসাবেও ভারতের কর্মীদের পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। রিপোর্ট বলছে, ভারতে আরও ৪০ শতাংশ কর্মী প্রতি সপ্তাহে ৬ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজ করেন। অর্থাৎ, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ভারতীয় কর্মীদের প্রায় ৬৬ শতাংশই সপ্তাহে অন্তত ছয় ঘণ্টা বেতনভুক্ত সময়ের বাইরে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।
এডিপি-র সংজ্ঞা অনুযায়ী, নির্ধারিত বেতনভুক্ত কর্মঘণ্টার বাইরে যে কাজ করা হয়, সেটিই এই সমীক্ষায় ‘বিনা পারিশ্রমিকের কাজ’ হিসেবে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লাঞ্চ ব্রেকের সময় কাজ করা, অফিসের নির্ধারিত সময়ের পরেও কাজ চালিয়ে যাওয়া কিংবা অফিস ছাড়ার পর বাড়ি থেকে কাজের দায়িত্ব সামলানো।
তবে এই জায়গাতেই ভারতের সঙ্গে বিশ্বের কর্মীদের ছবির বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সমীক্ষায় অংশ নেওয়া কর্মীদের ৬২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা সপ্তাহে সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত এমন অতিরিক্ত কাজ করেন। ৬ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন ২৬ শতাংশ এবং ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন মাত্র ১২ শতাংশ।
অর্থাৎ, বিশ্বের তুলনায় ভারতে সপ্তাহে ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করা কর্মীর হার দ্বিগুণেরও বেশি।
যত বড় পদ, তত বেশি কাজের চাপ?
রিপোর্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। কর্মীর পদমর্যাদা যত বেশি, বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজের প্রবণতাও তত বেশি। শীর্ষ কর্তা এবং সিনিয়র নেতৃত্বের প্রায় অর্ধেক জানিয়েছেন, তাঁরা সপ্তাহে অন্তত ছয় ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাজের সময় সপ্তাহে ১৬ ঘণ্টা বা তারও বেশি।
অন্যদিকে, সাধারণ স্তরের কর্মীদের মধ্যে ২৬ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত ছয় ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশের অতিরিক্ত কাজের সময় ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি।
বেশি সময় কাজ করলেই কি উৎপাদনশীলতা বাড়ে?
সমীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সম্ভবত এখানেই। দীর্ঘ সময় কাজ করলেই যে কর্মীর উৎপাদনশীলতা বাড়বে, তার কোনও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং রিপোর্ট বলছে, বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজের সময় যত বেড়েছে, কর্মীরা নিজেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদনশীল হতে না পারার অনুভূতিও তত বেশি জানিয়েছেন। বিশেষ করে সিনিয়র ম্যানেজার এবং শীর্ষস্তরের আধিকারিকদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট।
ফলে শুধু দীর্ঘ কর্মঘণ্টা নয়, কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ, বিশ্রামের সময় এবং কর্মীদের কাজ-জীবনের ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সমীক্ষার এই তথ্য দেখাচ্ছে, বেশি সময় অফিসের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানেই যে বেশি কার্যকর কাজ হচ্ছে, এমনটা নাও হতে পারে।