
শনিবার বিশাখাপত্তনমে অত্যাধুনিক স্টেলথ ফ্রিগেট 'INS মহেন্দ্রগিরি'-কে নৌসেনার অন্তর্ভুক্ত করলেন কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং। এই যুদ্ধজাহাজটি নৌসেনার 'প্রজেক্ট 17A' সিরিজের শেষ জাহাজ। এই অনুষ্ঠানে রাজনাথ সিং বলেন, অন্ধ্রপ্রদেশ এখন দেশের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোর এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ 'নার্ভ সেন্টার' হয়ে উঠছে।
মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (MDL) দ্বারা সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই মাল্টি-মিশন ব্লু-ওয়াটার যুদ্ধজাহাজটির ওজন প্রায় ৬,৬৭০ টন। এর ৭৫ শতাংশেরও বেশি যন্ত্রাংশ দেশীয়। এই যুদ্ধজাহাজে দেশীয় রকেট ও টর্পেডো লঞ্চার, অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট এবং ব্রহ্মোস সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল ছোড়ার মতো মারাত্মক ক্ষমতা রয়েছে।
পূর্ব উপকূলে এই হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠানে রাজনাথ সিং জানান, কীভাবে এই রাজ্যটি বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতের সামরিক শক্তির সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, "অন্ধ্রপ্রদেশ আজ ভারতের প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ উৎপাদন শিল্পের এক নতুন powerhouse হয়ে উঠছে। জল, স্থল, আকাশ এবং আনম্যানড ডোমেইন—সব ক্ষেত্রেই এই রাজ্য নিজের ভূমিকা পালন করছে। পুত্তপর্থীতে আমরা অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফটের (AMCA) কোর ইন্টিগ্রেশন ও ফ্লাইট টেস্টিং সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি। অনকাপল্লী জেলায় ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেডের (BDL) একটি নতুন নেভাল সিস্টেমস ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটেরও শিলান্যাস করা হয়েছে। এখানে অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল, টর্পেডো এবং আন্ডারওয়াটার কাউন্টার-মেজার সিস্টেম তৈরি হবে। এর মানে হলো, যে অস্ত্রগুলো আমরা বিদেশ থেকে আমদানি করতাম, সেগুলো এখন আমাদের ভাইজ্যাগের কাছেই তৈরি হবে। আকাশে AMCA, সমুদ্রের গভীরে BDL-এর নেভাল সিস্টেম, কুরনুলের ড্রোন এবং আজ সমুদ্রের বুকে INS মহেন্দ্রগিরি। এটা প্রমাণ করে যে অন্ধ্রপ্রদেশ এখন জল, স্থল, আকাশ এবং আনম্যানড ডোমেইন—সব ক্ষেত্রেই ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিকে মজবুত করছে।"
নৌশক্তি গুরুত্বপূর্ণ
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতীয় নৌসেনার ক্রমবর্ধমান ভূমিকা তুলে ধরে রাজনাথ সিং বলেন, নৌসেনা এখন এই অঞ্চলের 'নেট সিকিউরিটি প্রোভাইডার' হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ সুরক্ষিত রাখতে নৌসেনার সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন, "সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবার প্রমাণ করেছে যে কোনও দেশের জন্য একটি সক্ষম ও তৎপর নৌসেনা কতটা জরুরি। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর ভারতীয় নৌসেনা 'অপারেশন উর্জা সুরক্ষা'-র মাধ্যমে ১৮টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে এসকর্ট করেছে, যেগুলিতে ৯,০০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের জরুরি পণ্য ছিল। এটা দেখায় যে আমাদের নৌসেনা শুধু একটি যুদ্ধ শক্তিই নয়, ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এক শক্তিশালী রক্ষক হিসেবেও উঠে এসেছে।"
দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের দ্রুত গতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে রাজনাথ সিং বলেন, সময়মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ হাতে পাওয়া 'আত্মনির্ভর ভারত'-এর এক বড় সাফল্য।
তিনি আরও বলেন, "মাত্র দেড় বছরের মধ্যে আমাদের নৌসেনা ছয়টি ফ্রন্ট-লাইন ফ্রিগেট পেয়েছে। এটা ভারতের জাহাজ নির্মাণ ক্ষমতা এবং আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রমাণ। ভারত এতদিন সমুদ্রপথে নিজের রাস্তা তৈরি করেছে, কিন্তু এখন আমাদের দেশ সমুদ্রের গতিপথ নির্ধারণ করার ক্ষমতা তৈরি করছে।" এই প্রসঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'MAHA SAGAR' (মিউচুয়াল অ্যান্ড হোলিস্টিক অ্যাডভান্সমেন্ট ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রোথ অ্যাক্রস রিজিয়নস) ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
হাইব্রিড যুদ্ধের পরিবর্তিত প্রকৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাজনাথ সিং জোর দিয়ে বলেন, ভারত সব সময় নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে প্রচলিত সামরিক শক্তির মেলবন্ধনে বিশ্বাসী।
তিনি বলেন, "প্রচলিত প্ল্যাটফর্ম ছাড়া নতুন প্রযুক্তি অসম্পূর্ণ, আবার নতুন প্রযুক্তি ছাড়াও প্রচলিত প্ল্যাটফর্ম দুর্বল। ইতিহাস সাক্ষী, যে দেশগুলো নতুন প্রযুক্তির মোহে নিজেদের প্রচলিত শক্তিকে অবহেলা করেছে, তাদের চড়া মূল্য চোকাতে হয়েছে। ভারতের নীতি স্পষ্ট: আমাদের দুটো ক্ষেত্রেই সেরা হতে হবে।"
নেতৃত্বের মতে, INS মহেন্দ্রগিরি MDL সিরিজের 'ক্রাউনিং জুয়েল' বা সেরা রত্ন। আশা করা হচ্ছে, এই যুদ্ধজাহাজটি ভারতের পূর্ব উপকূলে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে নয়াদিল্লির সামুদ্রিক নজরদারি আরও শক্তিশালী করবে।