
মুম্বাইয়ের পক্ষে এখন আর আগের মতো করে সম্প্রসারিত হওয়া সম্ভব নয়। এখানে জমির পরিমাণ সীমিত এবং সম্পত্তির দামও আকাশচুম্বী। পাশাপাশি রাস্তাঘাট, আবাসন ও অবকাঠামোর ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। তাই মহারাষ্ট্র সরকার এখন আরও বড় একটি সমাধানের দিকে নজর দিচ্ছে—নভি মুম্বাইয়ের বাইরে একটি নতুন নগর গড়ে তোলা। 'মুম্বাই ৩.০' (Mumbai 3.0) নামে পরিচিত হতে যাওয়া 'কার্নালা-সাই-চিরনার' (KSC) নিউ টাউন প্রকল্পটি রায়গড় জেলার উরান, পানভেল ও পেন তালুকার ১২৪টি গ্রামকে অন্তর্ভুক্ত করে ৩২৩.৪৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে একটি পরিকল্পিত নগর-উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তুলবে। এই অঞ্চলের জন্য 'নিউ টাউন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি' হিসেবে 'মুম্বাই মেট্রোপলিটন রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি' (MMRDA)-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে অবস্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত শহরটি 'অটল সেতু' এবং 'নভি মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'-এর সন্নিকটে অবস্থিত, যা এটিকে ভারতের দ্রুততম বর্ধনশীল করিডোরগুলোর অন্যতম একটির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
মুম্বাই ইতিমধ্যেই তার মূল দ্বীপ-শহরের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে। এরপর নভি মুম্বাই হয়ে ওঠে পরবর্তী প্রধান নগরকেন্দ্র। কিন্তু বর্তমানে নভি মুম্বাইয়েও জমির জন্য তীব্র চাপ অনুভূত হচ্ছে। আর ঠিক এ কারণেই 'কেএসসি (KSC) নিউ টাউন'-এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। প্রকল্পটিকে কেবল আরেকটি আবাসিক উপশহর হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক ও আবাসিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর পরিকল্পনায় বাণিজ্যিক এলাকা, প্রযুক্তি হাব (technology hubs), লজিস্টিকস, ডেটা সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং আবাসিক এলাকার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর লক্ষ্য হল কর্মসংস্থান ও আবাসনকে একই সঙ্গে গড়ে তোলা, যাতে মানুষকে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে না হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১০৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় টাউনশিপ ও শিল্প করিডোর গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে বাকি এলাকায় সবুজ অঞ্চল, বনভূমি ও গ্রামীণ বসতি বজায় রাখা হবে। পরিকল্পিত উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটিকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তি-চালিত নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
'মুম্বাই ৩.০'-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হল যোগাযোগ ব্যবস্থা। 'অটল বিহারী বাজপেয়ী সেউরি-নহাভা শেভা অটল সেতু' মুম্বাই এবং নভি মুম্বাই-রায়গড় অঞ্চলের মধ্যকার যাতায়াতের সময় কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া প্রস্তাবিত শহরটি নভি মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পানভেল-কারজাত রেল করিডোর, ভিরার-আলিবাগ মাল্টি-মোডাল করিডোর এবং মুম্বাই-পুনে এক্সপ্রেসওয়ের সুবিধা থেকেও উপকৃত হবে। প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রে (ইকোসিস্টেম) তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ও আইটি-নির্ভর পরিষেবা, আর্থিক পরিষেবা, গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (GCC), ডেটা সেন্টার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, লজিস্টিকস এবং অন্যান্য ব্যবসার অন্তর্ভুক্তির আশা করা হচ্ছে।
এমএমআরডিএ (MMRDA) ব্রুকফিল্ডের কাছ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রস্তাবও নিশ্চিত করেছে, যা রিয়েল এস্টেট, ট্রানজিট-ভিত্তিক উন্নয়ন, লজিস্টিকস পার্ক, ডেটা সেন্টার এবং জিসিসি (GCC)-র মতো খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করবে।
সম্পত্তি ক্রেতা এবং ডেভেলপারদের জন্য, অবকাঠামো-চালিত এই বিশাল উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নতুন 'মাইক্রো-মার্কেট' বা ক্ষুদ্র বাজার এলাকা তৈরি করতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই প্রকল্পটিকে কেবল কংক্রিটের জঙ্গল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে না। সবুজ বলয় (green belts) এবং স্মার্ট-সিটি অবকাঠামোর উপর গুরুত্ব দেওয়াটা আশাব্যঞ্জক, কারণ ভবিষ্যতের নগর সম্প্রসারণে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও বাসযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
এমএমআরডিএ-র কাছ থেকেও এই প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্য গতি পাচ্ছে। অবকাঠামো-কেন্দ্রিক বাজেটের অংশ হিসেবে এমএমআরডিএ ২০২৬-২৭ সালের জন্য কার্নালা-সাই-চিরনার নিউ টাউন প্রকল্পের জন্য ৪,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। জমি অধিগ্রহণের কাজও এগিয়ে চলেছে। এমএমআরডিএ (MMRDA) সংশ্লিষ্ট ১২৪টি গ্রামের জমির মালিকদের জন্য ক্ষতিপূরণের বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, উন্নয়নের অধিকার এবং ‘ল্যান্ড পুলিং’ বা জমি একত্রীকরণ ব্যবস্থা। এটি এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।
তবে এই শহরটি রাতারাতি গড়ে উঠবে না। পরিকল্পনা ও জমি-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এই দশকের শেষ নাগাদ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়টি দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে, তবে সামগ্রিক ও বৃহত্তর নগর-কাঠামো গড়ে উঠতে আরও অনেক বেশি সময় লাগবে বলে আশা করা হচ্ছে।