
জরুরি অবস্থায় কয়েকটা মিনিটই জীবন আর মৃত্যুর ফারাক গড়ে দেয়। কিন্তু আমাদের দেশের বড় সমস্যা হল, অ্যাম্বুলেন্সই সময় মতো পৌঁছতে পারে না। শহরের বুক-ফাটা ট্র্যাফিক, সরু গলি, বাজারের ভিড় আর গ্রামের ভাঙাচোরা রাস্তা - সব মিলিয়ে চারচাকার অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়। আর তাতেই নষ্ট হয়ে যায় চিকিৎসার "গোল্ডেন আওয়ার"। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা দুর্ঘটনার পর এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা না পেলে রোগীকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে যায়।
এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানেই এবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক বড় সিদ্ধান্ত নিল। দেশে প্রথমবারের মতো চালু হতে চলেছে মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স। সম্প্রতি মন্ত্রকের তরফে এর জন্য খসড়া বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে। খসড়ায় পরিষেবার নিয়ম, বাইকের স্ট্যান্ডার্ড আর প্যারামেডিকদের ট্রেনিং নিয়ে বিস্তারিত গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। এর মানে হল খুব শীঘ্রই ভারতের রাস্তায় লাল-সাদা বাইক অ্যাম্বুলেন্স চোখে পড়বে।
এর পেছনে একটাই কারণ - দ্রুততা। চারচাকার অ্যাম্বুলেন্স যতই আধুনিক হোক না কেন, জ্যামে আটকে গেলে তার কিছু করার থাকে না। অন্যদিকে সরু গলি, বস্তি এলাকা বা পাহাড়ি গ্রামে বড় গাড়ি ঢোকানোই যায় না। অনেক সময় রোগীর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতেই ৩০-৪০ মিনিট লেগে যায়। মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স এই সমস্যা একেবারে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলবে। ছোট সাইজের জন্য এটা যেকোনো ভিড়, যেকোনো সরু রাস্তা দিয়ে সাইরেন বাজিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যেতে পারবে। বিশেষ করে দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতার মতো মেট্রো শহর আর উত্তর-পূর্ব বা পাহাড়ি রাজ্যগুলোর জন্য এটা আশীর্বাদের মতো।
অনেকে ভাবতে পারেন বাইকে আবার কী চিকিৎসা হবে। কিন্তু খসড়া অনুযায়ী এই বাইকগুলো হবে একেবারে মিনি আইসিইউ। প্রতিটি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্সে থাকবে পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার, অটোমেটিক ডিফিব্রিলেটর বা AED, ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্র, প্রাথমিক ওষুধ, ব্যান্ডেজ, স্প্লিন্ট আর ফোল্ডিং স্ট্রেচার। এছাড়া রিয়েল টাইম লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের জন্য জিপিএস সিস্টেম আর হাসপাতালের সাথে কথা বলার জন্য ওয়্যারলেস সেটও থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যিনি বাইক চালাবেন। তিনি হবেন বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ইএমটি বা প্যারামেডিক। খসড়ায় বলা হয়েছে, তাদের অ্যাডভান্স লাইফ সাপোর্টের ট্রেনিং থাকতে হবে। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছেই সিপিআর, অক্সিজেন দেওয়া, রক্তপাত বন্ধ করার মতো প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করে দেবেন। প্রয়োজনে বড় অ্যাম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত রোগীকে স্টেবল রাখবেন।
আপাতত এটাকে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। প্রথম দফায় দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই আর গুয়াহাটির মতো শহরে এই পরিষেবা চালু হবে। পাশাপাশি হিমাচল, উত্তরাখণ্ড আর উত্তর-পূর্বের দুর্গম এলাকাতেও বাইক অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হবে। পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে ২০২৭ সালের মধ্যে সারা দেশের প্রতিটি জেলায় এই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র।
ফোন নম্বরের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। 108 বা 102-এর পাশাপাশি বাইক অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আলাদা একটি শর্টকোড নম্বর চালু করা হতে পারে। অ্যাপের মাধ্যমেও বুকিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।
মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স শুধু একটা নতুন গাড়ি নয়। এটা হল জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবার নতুন ভাবনা। ট্র্যাফিক আর ভূগোলের বাধা পেরিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। খসড়া বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার ফলে আশা করা যায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এই পরিষেবার কাজ শুরু হয়ে যাবে।