
শুক্রবার জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার জয়ীদের নিজের বাসভবন, ৭ লোক কল্যাণ মার্গে ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে শিক্ষকদের সঙ্গে এক্কেবারে খোলামেলা আড্ডায় মাতেন তিনি। পড়ানোর নতুন কৌশল, বক্তৃতা দেওয়ার টিপস, স্ক্রিন আসক্তি, ড্রাগসের সমস্যা থেকে শুরু করে "শিশুদের শৈশব বাঁচিয়ে রাখা"র মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।
শিক্ষক দিবসে এই বৈঠকের একটি ভিডিও এক্স -এ শেয়ার করে মোদী লেখেন, "আমাদের সমাজে শিক্ষকদের জোরালো অবদানের প্রশংসা করার দিন হল শিক্ষক দিবস। এই দিন ডঃ এস. রাধাকৃষ্ণণকে শ্রদ্ধা জানানোরও দিন।"
এক শিক্ষিকা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, তিনি ছাত্রছাত্রীদের মজার ছলে ইন্টারভিউ নেওয়া শেখাচ্ছেন। শুনেই মোদী রসিকতা করে বলেন, "তাহলে তো ওরা বাড়িতে বাবা-মায়েরও ইন্টারভিউ নেয়! যেমন, 'আজ এটা কেন রান্না করলে? এভাবে কেন করলে? এই সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছে? বাজেটে কত খরচ হল?'" ওই শিক্ষিকা হেসে বলেন, "হ্যাঁ স্যার। আর এখন তো মজার জন্য আমার স্কুলের সব বাচ্চাই রিপোর্টার হতে চায়।"
আরেকজন শিক্ষিকা, যিনি পড়ুয়াদের পাবলিক স্পিকিং বা বক্তৃতা দেওয়ার প্রশিক্ষণ দেন, তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করে বসেন, "যদি আমি আপনার ছাত্র হতাম আর একজন ভালো বক্তা হতে চাইতাম, আপনি আমাকে কী টিপস দিতেন? আমার কী করা উচিত?" শিক্ষিকা বলেন, "প্রথমত, আপনাকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। আর আত্মবিশ্বাস আসে অনেক অনুশীলনের মাধ্যমে।" কিন্তু এরপরেই তিনি স্বীকার করেন যে তিনি নিজেই কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েছেন।
"স্যরি স্যার... আপনার 'অরা' দেখে আমি নিজেই একটু নার্ভাস হয়ে গিয়েছি," বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী মুচকি হেসে পাল্টা প্রশ্ন করেন, "তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে ভালো বক্তা হওয়ার জন্য 'অরা' থাকা উচিত নয়?"
শিক্ষিকা সঙ্গে সঙ্গে বলেন, "না না, অবশ্যই থাকা উচিত। আপনার তো সেটা আছেই স্যার।" এর উত্তরে মোদী বলেন, "তাহলে তো লোকে শুনবেই না! শুধু আপনার 'অরা'-র দিকেই তাকিয়ে থাকবে।" শিক্ষিকা হেসে যোগ করেন, "ওরা শুধু আপনার দিকে তাকিয়েই থাকতে পারে, স্যার।"
মোদী শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করেন, যারা পড়াশোনায় হয়তো ততটা ভালো নয়, তাদের মধ্যে থাকা অন্য প্রতিভা খুঁজে বের করার চেষ্টা তাঁরা করেন কি না। তিনি প্রশ্ন করেন, "হতে পারে একটা বাচ্চা পড়াশোনায় ভালো নয়। কিন্তু ঈশ্বর প্রত্যেককে কিছু না কিছু শক্তি দিয়েছেন। আপনারা শিক্ষকরা কি সেই প্রতিভা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন?" এক শিক্ষক উত্তরে বলেন, "আমরা অনেক চেষ্টা করি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আমাদের স্কুলের প্রত্যেক বাচ্চার মধ্যেই আলাদা গুণ, আলাদা প্রতিভা বা আলাদা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।"
এক পুরস্কারজয়ী শিক্ষিকা মোদীর 'একলব্য স্কুল' উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, "একলব্য স্কুল খুলে আপনি শুধু একটা স্কুল তৈরি করেননি... আমার মতে, আপনি সেই সব পরিবারের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছেন, যাদের পড়ুয়ারা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। ওরা কখনও স্কুলের মুখ দেখেনি। আর আজ তাদের ছেলেমেয়েরা NIT, IIT-তে পড়ার স্বপ্ন দেখছে, মেডিকেলের পরীক্ষায় পাশ করছে।"
এক শিক্ষিকা মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করেন। তিনি বলেন, "আজও স্তন ক্যান্সার এমন একটা বিষয় যা নিয়ে মহিলারা কথা বলতে খুব দ্বিধা বোধ করেন। তাই আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করি, যেমন প্রাথমিক স্ক্রিনিং বা তাদের কিছু জরুরি তথ্য দেওয়া, যাতে তারা শুরুতেই বুঝতে পারে যে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া দরকার কি না।"
এই প্রসঙ্গে মোদী কাশীতে তাঁর নিজের প্রচার কর্মসূচির কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, "যেহেতু আপনি এই বিষয়ে কাজ করছেন, আমি কাশীর সাংসদ। সেখানে আমি স্তন ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে একটি অভিযান শুরু করেছিলাম। আর আমি খুব খুশি যে আজকাল মহিলারা নিজেরাই চেক-আপের জন্য এগিয়ে আসছেন।" তিনি আরও জানান যে এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিনে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের স্ক্রিনিং করার জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও হয়েছিল।
আজকের দিনের অন্যতম বড় সমস্যা, বাচ্চাদের স্ক্রিন টাইম বেড়ে যাওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোদী। তিনি একে "এক ধরনের আসক্তি" বলে উল্লেখ করেন এবং এর থেকে বেরোনোর উপায় হিসেবে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজের কথা বলেন। "হয় সেই বাচ্চাকে খেলাধুলোয় আগ্রহী করে তুলতে হবে... আর খেলাধুলা মানে ভিডিও গেম নয়, মাঠে নেমে খেলা। তাহলে ধীরে ধীরে তারা এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আর বাচ্চাদের যতটা সম্ভব সৃজনশীল কাজে যুক্ত করার অভ্যাস আমাদের তৈরি করতে হবে।"
পড়ুয়াদের মধ্যে ড্রাগসের ব্যবহার নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করে শিক্ষকদের সতর্ক থাকতে বলেন তিনি। "এখন যেমন ড্রাগসের কথাই ধরুন। এটা এখন আর শুধু বড় শহর বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। কেউ জানেই না এটা কী, কেউ এসে দিয়ে যায়," বলেন তিনি।
সব শেষে মোদী গোটা শিক্ষক সমাজের কাছে একটি আবেদন রাখেন। "আমাদের এখন বই আর সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে এসে বাচ্চাদের জীবনে আরও বেশি করে ঢুকতে হবে। শৈশবকে মরে যেতে দেওয়া উচিত নয়। আর এই শৈশবকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় কাজটা একজন শিক্ষকই করতে পারেন। বাচ্চার ভেতরের শিশুটাকে বাঁচিয়ে রাখাই শিক্ষকের কাজ," বলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ৪৮ জন স্কুল শিক্ষককে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার প্রদান করেন। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৬ জন পুরুষ এবং ২২ জন মহিলা শিক্ষক রয়েছেন, যারা ২৭টি রাজ্য, ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং ৬টি কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা থেকে এসেছেন। জেলা, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে—এই তিন ধাপে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরস্কারজয়ীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শিক্ষক দিবস পালিত হয়। তাঁর স্মৃতিতেই এই দিনটি সারা দেশের শিক্ষকদের প্রতি উৎসর্গ করা হয়।