
চারদিকে যখন শুধুই রাজনীতি আর ভেদাভেদের খবর, তখন রাজস্থানের পালির এই ছোট্ট দোকানটা যেন সম্প্রীতির এক দারুণ উদাহরণ। ঐতিহাসিক সোমনাথ মন্দিরের ঠিক পাশেই রয়েছে লোহার জিনিসপত্র তৈরির এই দোকান। প্রায় ১০০ বছরের পুরনো এই দোকান। স্বাধীনতার আগে থেকেই এই পরিবারের মানুষজন এখানে কাজ করছেন। একসময় দাদু আর বাবা এই দোকানের হাঁপর টানতেন। আর আজ উসমান, ইব্রাহিম এবং ৬০ বছরের আয়ুব সেই পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
এটা কিন্তু শুধু লোহার জিনিস বিক্রির দোকান নয়। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এখানে লোহা পুড়িয়ে, হাতুড়ি পিটিয়ে নানা আকারের জিনিসপত্র তৈরি করা হচ্ছে। কোদাল, তাওয়া, কড়াই, স্টোভ থেকে শুরু করে চাষবাসের নানা সরঞ্জাম এখানে বানানো হয়। লোহাকে গরম করে নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট আকার দেওয়ায় এই পরিবারের জুড়ি মেলা ভার।
এই দোকানের সবচেয়ে বড় চমক হলো, এখানে হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান প্রতীক ত্রিশূল তৈরি করা হয়। ৬০ বছর বয়সী আয়ুব জানান, তাঁর দাদু আর বাবার আমল থেকেই এই কাজ হয়ে আসছে। সাধারণ গৃহস্থালির জিনিসের পাশাপাশি তাঁরা শিবের ভক্তিস্বরূপ ত্রিশূলও বানান। শুধু ত্রিশূল নয়, মন্দিরে আরতির জন্য ব্যবহৃত 'কুপেরা' সহ আরও বেশ কিছু লোহার সরঞ্জাম এই পরিবারই তৈরি করে। সোমনাথ মন্দিরের আরতির শব্দের সঙ্গে এই দোকানের হাতুড়ি পেটার শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে।
এই পরিবারের ঐতিহ্যের আরও এক সাক্ষী হলো তাঁদের প্রায় ৮০ বছরের পুরনো বাড়ি। আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ির দেওয়ালে '১৯৪৭' সাল খোদাই করা আছে। স্বাধীনতার সময় থেকে আজ পর্যন্ত অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী এই বাড়ি আর দোকান। এগুলো শুধু ইট-পাথরের ইমারত নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের পরিশ্রম, দক্ষতা আর পারিবারিক পেশার স্মৃতি বহন করছে।
দাদুর হাত থেকে বাবার কাছে, আর বাবার থেকে পরের প্রজন্মের কাছে এই পেশা হস্তান্তর হয়েছে। আজ উসমান, ইব্রাহিম আর আয়ুব তাঁদের পূর্বপুরুষদের জ্বালানো চুল্লির আগুন নিভতে দেননি। স্থানীয় মানুষজনও বছরের পর বছর ধরে এই পরিবারের কাজ দেখে আসছেন। এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই পরিবারকে একই কাজ করতে দেখছেন। মন্দিরের আরতিতে ব্যবহৃত বেশ কিছু পাত্র আর সরঞ্জামও যে এখানেই তৈরি হয়, সে কথাও জানান স্থানীয়রা।