
মাওবাদীবিরোধী অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্যতম বড় সাফল্য। ঝাড়খণ্ড থেকে গ্রেফতার কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওবাদী)-র শীর্ষ কমান্ডার ও পলিটব্যুরোর সর্বশেষ সক্রিয় সদস্য মিসির বেসরা। তঁর চার সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। বেসরার মাথার দাম ছিল ১ কোটি টাকা। ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মাওবাদী নেতা এবং বামপন্থী উগ্রবাদের প্রধান ব্যক্তিত্ব বেসরা পূর্ব ভারতের 'রেড করিডোর' বা মাওবাদী-প্রভাবিত অঞ্চলজুড়ে নিষিদ্ধ সংগঠনটির কার্যক্রম সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। নিরাপত্তা কর্মীদের উপর হামলা, তোলাবাজি, অস্ত্র পাচার এবং হিংসার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, গিরিডি জেলার বাসিন্দা বেসরাকে ধানবাদ জেলা থেকে গ্রেফতার করা হয়। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সহায়তায় ঝাড়খণ্ড পুলিশ যৌথভাবে এই অভিযান চালায়। এর আগে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর উপর নজর রাখা হয়েছিল। ধরা পড়া অন্য চার মাওবাদীর পরিচয় প্রকাশ করেনি। প্রাথমিক তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবৃতি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রায় দুই দশক ধরে অধরা
প্রায় দুই দশক ধরে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান সত্ত্বেও বেসরা নিরাপত্তা বাহিনীর নাগালের বাইরে ছিলেন। সিপিআই (মাওবাদী)-র পলিটব্যুরোর এই প্রবীণ সদস্য এর আগে ২০০৭ সালে গ্রেফতার হয়েছিলেন। যদিও ২০০৯ সালে পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যান। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঝাড়খণ্ডের বনাঞ্চলে অভিযান জোরদার করেছিল এবং তাঁকে আত্মসমর্পণে রাজি করানোর জন্য পরিবারের কাছে বারবার আহ্বান জানিয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরার বিরুদ্ধে একাধিক রাজ্যে ১৫৪টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে এবং অভিযোগ রয়েছে যে তিনি বছরের পর বছর ধরে মাওবাদীদের বেশ কয়েকটি বড় হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং মাওবাদী-প্রভাবিত অন্যান্য রাজ্যে দায়ের করা মামলায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন।
ঝাড়খণ্ড পুলিশের কাছে ১৬ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ
তদন্তকারীরা আশা করছেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মাওবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যাবে। এর মধ্যে রয়েছে সক্রিয় ক্যাডারদের পরিচয়, সাংগঠনিক কাঠামো, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের পথ, লজিস্টিক বা রসদ সহায়তা ব্যবস্থা, ফান্ডিংয়ের উৎস এবং পরিকল্পিত অভিযানের বিস্তারিত তথ্য। এর আগে মঙ্গলবার ঝাড়খণ্ড পুলিশের কাছে ১৬ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেন। এদের মধ্যে ছয়জন বিদ্রোহী ছিলেন, যাদের মাথার দাম ছিল মোট ৩৯ লক্ষ টাকা। যারা অস্ত্র সমর্পণ করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন নিষিদ্ধ সিপিআই (মাওবাদী)-র আঞ্চলিক কমিটির সদস্য সন্তোষ মাহাতো (ওরফে বাসুদেব দা বা দিলীপ)। তাঁর মাথার দাম ছিল ১৫ লক্ষ টাকা এবং তিনি ১২৮টি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বা ‘ওয়ান্টেড’ ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, সন্তোষ বেশ কয়েকটি বড় ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে ১ মার্চ মনোহরপুর, ছোটানগর ও ঝারিয়াকেলা থানা এলাকার অন্তর্গত বনাঞ্চলে আইইডি (IED) বিস্ফোরণের ঘটনা, যাতে কোবরা (CoBRA) ব্যাটালিয়নের এক জওয়ান আহত হয়েছিলেন।
আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীদের দলে পাঁচজন মহিলা ক্যাডারও রয়েছেন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে একজন জোনাল কমিটির সদস্য, দুজন সাব-জোনাল কমিটির সদস্য এবং দু'জন এরিয়া কমিটির সদস্যও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রয়েছেন নিষিদ্ধ সিপিআই (মাওবাদী)-র জোনাল কমিটির সদস্য চন্দন লোহরা (৭৮টি মামলায় অভিযুক্ত ও ১০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষিত), সাব-জোনাল কমিটির সদস্য অনিল টুড়ি (ওরফে উজ্জ্বল) ও সুখলাল বিরজিয়ান (ওরফে আকেলা)—যাদের প্রত্যেকের মাথার দাম ৫ লক্ষ টাকা। এবং এরিয়া কমিটির সদস্য সুদেশ হোনহাগা (ওরফে সোনারাম হোনহাগা) ও ঋষিব—যাদের প্রত্যেকের মাথার দাম ২ লক্ষ টাকা। এছাড়া জোনাল কমিটির সদস্য সন্তোষ মাঝি (ওরফে জগবন্ধু)-ও আত্মসমর্পণ করেছেন।
আত্মসমর্পণকারী ক্যাডাররা পুলিশের কাছে ছয়টি ইনসাস (INSAS) রাইফেল, দুটি একে-৪৭ (AK-47) রাইফেল, ৩৮টি ম্যাগাজিন এবং ১,৫৬২ রাউন্ড গুলি জমা দিয়েছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী-বিরোধী অভিযান উল্লেখযোগ্য গতি পেয়েছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী ৯৩ জন মাওবাদীকে গ্রেফতার করেছে, ৪৫ জন ক্যাডারের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করেছে এবং সংঘর্ষে ২২ জন চরমপন্থীকে নিকেশ করেছে।