
উৎসবের মরসুমের আগে চিনির দাম হুহু করে বাড়ছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে সাধারণ মানুষের। তবে কী কারণে চিনির এই আচমকা মূল্যবৃদ্ধি? তাই নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা। সাধারণ মানুষ চিনির এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ইথানল উৎপাদনকে দায়ী করছে। কিন্তু এটা ঠিক নয় বলে সাফ জানিয়ে দিল কেন্দ্র।
সরকারের মতে, হঠাৎ করেই চিনির দাম বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। যেমন, প্রয়োজনের চেয়ে কম উৎপাদন, উৎসবের কারণে চাহিদা বৃদ্ধি, খারাপ আবহাওয়ায় আখের ফসল নষ্ট হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির জোগান কমে যাওয়া এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মজুতদারি।
ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রক জানিয়েছে, সরকার পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে। সাধারণ মানুষের জন্য চিনির জোগান স্বাভাবিক রাখতে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তথ্য বলছে, গত ২০ জুলাই প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৪৮.১৮ টাকা, যা ২০ আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫.৭০ টাকায়। অর্থাৎ গত এক মাসে ৮ টাকারও বেশি দাম বেড়েছে চিনির। এই পরিস্থিতিতেই দাম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়েছে সরকার।
মন্ত্রক জানিয়েছে, "চিনির দাম বাড়ার জন্য ইথানল উৎপাদনে চিনি ব্যবহারকে দায়ী করাটা ভুল।" বরং তথ্য দিয়ে মন্ত্রক দেখিয়ে দিয়েছে ইথানল উৎপাদনের প্রভাব চিনির মূল্যবৃদ্ধির ওপর পড়ে না।
২০২২-২৩ সালে যেখানে প্রায় ১২ শতাংশ চিনি ইথানল তৈরিতে ব্যবহার হতো, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে তা কমে প্রায় ৯ শতাংশে দাঁড়াবে। এখন দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ইথানল তৈরি হচ্ছে ভুট্টা-সহ অন্যান্য শস্য থেকে।
মন্ত্রকের বয়ান অনুযায়ী, "চিনির দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে কম উৎপাদন, উৎসবের মরসুমে চাহিদা বৃদ্ধি, আখের ফসলের ক্ষতি, আন্তর্জাতিক বাজারে জোগান সংকট এবং কিছু মহলের মজুতদারি।" চলতি মরসুমে দেশে ৩৪৩ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের অনুমান করা হলেও, বাস্তবে উৎপাদন ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টনে নেমে আসতে পারে।
এর কারণ হিসেবে রেড রট ও টপ বোরার রোগের প্রকোপ এবং অতিবৃষ্টির ফলে জমিতে জল জমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও উৎপাদন কম, অক্টোবরে নতুন মরসুম শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত দেশের চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট চিনি মজুত আছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রক।
আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির জোগান কমেছে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে ২০২৬-২৭ সালের জন্য বিশ্বজুড়ে চিনির ঘাটতি ৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ৩০ জুন চিনির দাম প্রতি টনে ৪৭৪ মার্কিন ডলার থাকলেও, ২০ আগস্টে তা বেড়ে ৫৫২ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, দু'মাসেরও কম সময়ে দাম বেড়েছে ১৬ শতাংশের বেশি।
দেশের বাজারে মজুতদারি রুখতে ডিলারদের জন্য ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৪০০ টন চিনি মজুতের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বড় ক্রেতাদের জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ দিনের বেশি চিনি মজুত রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। চিনির মিলগুলিতে গিয়ে মজুতের পরিমাণ খতিয়ে দেখছে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ দল, যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।
মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, "সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে, সরকার ১০ লক্ষ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে দেশের বাজারে জোগান আরও বাড়ে।" চিনির মিলগুলিকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে আখ মাড়াই শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অক্টোবরে যেখানে সাধারণত ৩-৪ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়, সেখানে উৎপাদন ১০ লক্ষ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রক উল্লেখ করেছে যে, ইথানল উৎপাদনে চিনি পাঠানোর মতো কাঠামোগত সংস্কারের ফলে মিলগুলির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং ২০২১-২২ সাল থেকে ভর্তুকির উপর নির্ভরতা কমেছে। এর ফলে মিলগুলি ২০২৫-২৬ মরসুমের জন্য চাষিদের ৯৭ শতাংশ বকেয়া ২০ আগস্টের মধ্যে মিটিয়ে দিতে পেরেছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে চিনির খুচরো দাম বছরে মাত্র ৩ শতাংশ হারে বেড়েছে। মন্ত্রক শেষে যোগ করেছে, "সরকার ক্রেতা এবং আখ চাষি—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করতে দায়বদ্ধ।" অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রুখতে মজুত ও ব্যবসার উপর নজরদারি চলবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে