
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ভারতীয়দের পরিবারকে সাহায্য করার জন্য কেন্দ্রকে একগুচ্ছ নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার শীর্ষ আদালত বিদেশ মন্ত্রককে (MEA) একজন নোডাল অফিসার নিয়োগ করতে বলেছে। এই অফিসার ট্র্যাভেল এজেন্টদের প্রতারণার শিকার হয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হওয়া এবং যুদ্ধে নিহত বা আহত ভারতীয়দের পরিবারকে সাহায্য করবেন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, ওই নোডাল অফিসারের যোগাযোগের বিবরণ মৃত ও আহতদের পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে। পাশাপাশি, মৃতদেহ শনাক্ত করার জন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং ডিএনএ ভেরিফিকেশনের পরেই দেহ হস্তান্তর করতে হবে।
আরও পড়ুন - ২০২২ সালেই ইউক্রেনে পরমাণু হামলা চালাত রাশিয়া, পুতিনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আটকান প্রধানমন্ত্রী মোদী
আদালত আরও বলেছে, ক্ষতিপূরণের জন্য রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে কীভাবে আবেদন করতে হবে, সেই পদ্ধতি বুঝিয়ে একটি নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে। এই নির্দেশিকা স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দিতে হবে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, ক্ষতিপূরণের আবেদন বিদেশ মন্ত্রকের মাধ্যমেই করতে হবে, তবে এর জন্য যেন মৃতদেহ ফেরাতে বা শেষকৃত্য করতে দেরি না হয়। আদালত রাজ্য লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটিগুলোকে (State Legal Services Authorities) বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে। এছাড়া, রাশিয়া থেকে পাওয়া দেহ হস্তান্তর এবং ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত নথি অনুবাদ করে দেওয়ার দায়িত্বও বিদেশ মন্ত্রককে নিতে বলা হয়েছে।
আদালত তার নির্দেশে উল্লেখ করেছে, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে বহু ভারতীয় যুবক চাকরির আশায় রাশিয়া গিয়েছিলেন। তাঁদের নির্মাণ, হোটেল বা পরিষেবা ক্ষেত্রে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছনোর পরেই তাঁদের পাসপোর্ট এবং পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আদালত দেখেছে, বহু তরুণ ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন এবং শনাক্তকরণ সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের মৃতদেহ দেশে ফেরানো হয়নি। এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই পরিবারগুলোর জন্য একগুচ্ছ নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
শুনানির সময় আবেদনকারীদের আইনজীবী ঋত্বিক ভানোত অভিযোগ করেন, বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও বিদেশ মন্ত্রক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উদ্বেগে সাড়া দেয়নি। তিনি বলেন, "রাশিয়া থেকে যে দেহগুলো আসছে, সেগুলো এতটাই পচেগলে গিয়েছে যে শুধু হাড় আর মাংসপিণ্ড ছাড়া কিছু থাকছে না। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া শনাক্ত করা অসম্ভব।" তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো নয় এবং তাঁরা শুধু বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে একটি বৈঠক ও ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করার আর্জি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন - Trump: গাজায় হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার ঐতিহাসিক চুক্তি, ধাপে ধাপে সেনা সরাবে ইজরায়েল
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল (ASG) ঐশ্বর্য ভাটি জানান, কেন্দ্র ইতিমধ্যেই একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং ক্ষতিপূরণ ও দেহ ফেরানোর পদ্ধতি জানিয়ে একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তিনি আদালতকে বলেন, রাশিয়া ডিএনএ ম্যাচিং ছাড়া দেহ হস্তান্তর করছে না এবং বিদেশ মন্ত্রক গত কয়েক মাস ধরে সরাসরি পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
ভাটি অভিযোগ করেন, এই মামলা চলার কারণে গোটা প্রক্রিয়ায় অহেতুক দেরি হচ্ছে এবং পরিবারগুলোকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। তিনি আবেদনকারীর আইনজীবীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মন্তব্য করারও অভিযোগ তোলেন। এর জবাবে আইনজীবী ভানোত স্বীকার করেন যে তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন কারণ মামলাটি মানসিকভাবে খুবই চাপের। তখন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী আইনজীবীকে পেশাদারি সংযম বজায় রাখার পরামর্শ দেন এবং অ্যাক্টিভিজমের বদলে আইনি পথে এগোনোর কথা বলেন।
এই মামলাটি ২৬ জন ভারতীয়র পরিবার দায়ের করেছিল। তাঁদের অভিযোগ, চাকরি বা পড়াশোনার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের আত্মীয়দের রাশিয়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। তাঁরা আটকে পড়া ব্যক্তিদের খোঁজখবর নেওয়া, জীবিতদের ফিরিয়ে আনা, নিহতদের দেহ দেশে ফেরানো এবং ক্ষতিপূরণের জন্য জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়েছিলেন।
এপ্রিলে একটি শুনানিতে কেন্দ্র জানিয়েছিল, এই ২৬ জনের মধ্যে ১০ জন যুদ্ধে মারা গিয়েছেন, একজনের বিরুদ্ধে রাশিয়ায় ফৌজদারি মামলা চলছে এবং একজন স্বেচ্ছায় সামরিক চুক্তি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকার আরও জানায়, কিছু ভারতীয় এজেন্টদের দ্বারা প্রতারিত হলেও, অন্যরা জেনেশুনেই চুক্তিতে সই করেছিলেন।
শুক্রবার আদালতের এই নির্দেশগুলো পরিবারগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া এবং শনাক্তকরণ, দেহ ফেরানো ও ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া দ্রুত করার লক্ষ্যে দেওয়া হয়েছে।