
ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হলে গ্রাহকের হারানো টাকা ফেরানোর দায় এবার ব্যাঙ্কের উপরেও বর্তাতে পারে। ব্যাঙ্কের গাফিলতি বা যথাযথ সতর্কতার অভাবে সাইবার প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্তে প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষ করে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর মতো প্রতারণা রুখতে ব্যাঙ্কগুলির দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছে শীর্ষ আদালত। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ এই বিষয়ে শুনানি করে। আদালতের বক্তব্য, শুধু সতর্কবার্তা জারি করলেই হবে না। সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করা, প্রয়োজন হলে তা সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া এবং প্রতারণা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ব্যাঙ্কগুলিকে দায়বদ্ধ করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনও গ্রাহকের সঙ্গে ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যথাযথ যাচাই বা সতর্কতার অভাব প্রমাণিত হলে, প্রস্তাবিত নিয়মে গ্রাহকের হারানো অর্থের সমপরিমাণ বা তার কম নয়—এমন ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই লক্ষ্যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-র প্রস্তাবিত KYC সংশোধনী নির্দেশিকা, ২০২৬ খতিয়ে দেখবে আদালত। সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জারি এবং ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া এবং চূড়ান্ত নিয়ম কার্যকর হওয়ার বিষয়টি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
সন্দেহজনক লেনদেন আটকে দেওয়ার উপর জোর
আদালত মনে করছে, কোনও গ্রাহকের স্বাভাবিক লেনদেনের ধরন থেকে হঠাৎ বড়সড় অঙ্কের লেনদেন হলে ব্যাঙ্কের নজরদারি ব্যবস্থা তা চিহ্নিত করতে পারা উচিত। যেমন, কোনও গ্রাহক সাধারণত ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা লেনদেন করেন, অথচ হঠাৎ তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে অনেক বেশি টাকা সরানোর চেষ্টা হচ্ছে—সেক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। এ জন্য ব্যাঙ্কগুলিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং গ্রাহকের পূর্ববর্তী লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে তার সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পুলিশকে জানানো এবং প্রয়োজনে সরেজমিনে যাচাইয়ের ব্যবস্থাও প্রস্তাবিত কাঠামোর অংশ।
ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণায় অপরাধীরা কখনও পুলিশ, তদন্তকারী সংস্থা বা সরকারি আধিকারিকের পরিচয় দিয়ে ভিডিও কলের মাধ্যমে মানুষকে ভয় দেখায়। গ্রেফতারি বা আইনি পদক্ষেপের ভয় দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়। শুনানিতে আদালত এই ধরনের প্রতারণা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংবাদ সংস্থা PTI-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে সাইবার অপরাধের কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপে প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রতিটি ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনায় ব্যাঙ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য—এমন সিদ্ধান্ত এখনই ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ব্যাঙ্কের যথাযথ সতর্কতার ঘাটতি এবং তার সঙ্গে প্রতারণার যোগসূত্র প্রমাণিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চূড়ান্ত RBI নির্দেশিকা ও আদালতের পরবর্তী নির্দেশের উপর নির্ভর করবে নিয়মের বাস্তব প্রয়োগ।