
Water Crisis: ভারতের একাধিক মেগাসিটি এবং জনবহুল এলাকা দ্রুত ভূগর্ভস্থ জল হারিয়ে 'ডে জিরো' (Day Zero) বা সম্পূর্ণ জলশূন্যতার দিকে এগিয়ে চলেছে, যার ফলে ইতিমধ্যে কোটি কোটি মানুষের জীবনে হাহাকার শুরু হয়েছে।
নীতি আয়োগের Composite Water Management Index (CWMI) এবং জল শক্তি মন্ত্রকের Dynamic Groundwater Resource Assessment Report-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ২১টি বড় শহরের ভূগর্ভস্থ জলস্তর বিপজ্জনক স্তরে নেমে গেছে। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত বোরওয়েল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ চরম জলকষ্টের মুখোমুখি।
১.গ্রেটার হায়দরাবাদ (তেলঙ্গানা): দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলবর্তমান পরিস্থিতির কথা বলতে গেলে, কেন্দ্রীয় জল শক্তি মন্ত্রকের ২০২৫-২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, দিল্লির মতো মেগাসিটিকে পেছনে ফেলে বর্তমানে হায়দরাবাদ দেশের সবচেয়ে বিপর্যস্ত ভূগর্ভস্থ জলপীড়িত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রভাব: গ্রেটার হায়দরাবাদের ২৬টি মন্ডল ও তহসিল এলাকাকে 'অতি-শোষিত' (Over-exploited) বা আশঙ্কাজনক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে জলের স্তর এতটাই নিচে নেমেছে যে ট্যাঙ্কার ছাড়া সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
২. বেঙ্গালুরু (কর্ণাটক): সিলিকন ভ্যালির শুকনো পাইপলাইন বর্তমান পরিস্থিতি: এককালে ২৬০ টিরও বেশি হ্রদের শহর বেঙ্গালুরুতে আজ মাত্র ৮০-৮১টি হ্রদ টিকে রয়েছে। আইটি হাব হিসেবে পরিচিত এই শহরের হাজার হাজার বোরওয়েল সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে।
প্রভাব: আবাসন এবং বহুতল ভবনগুলিতে জলের ব্যবহার নিয়ে কড়া নিয়ম জারি করতে হয়েছে। ১০০ কিলোমিটার দূর থেকে কাভেরি নদীর জল এনেও এবং চড়া দামে বেসরকারি ওয়াটার ট্যাঙ্কার বুক করেও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।
৩. নতুন দিল্লি ও এনসিআর (NCR): যমুনার দূষণ ও পানীয় জলের হাহাকার, বর্তমান পরিস্থিতি বলতে, দিল্লির প্রায় ৩.৩ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ভূগর্ভস্থ জল স্তরের ২১টি ইউনিট 'গুরুতর' অবস্থায় রয়েছে। দিল্লি তার পানীয় জলের ৬০%-এরও বেশি যমুনা নদী থেকে সংগ্রহ করে, যা মারাত্মকভাবে দূষিত।
প্রভাব: গরমের মরসুমে দিল্লির Jal Board-কে দৈনিক ১,০০০-এর বেশি জলের ট্যাঙ্কার নামাতে হচ্ছে। বস্তি এলাকা থেকে শুরু করে অভিজাত আবাসন—সব জায়গায় জল নিয়ে মারামারি এবং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার চেনা ছবি তৈরি হয়েছে।
৪. চেন্নাই (তামিলনাডু): 'ডে জিরো'-র পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাবর্তমান পরিস্থিতি: ২০১৯ সালে ভারতের প্রথম বড় শহর হিসেবে চেন্নাইয়ের ৪টি প্রধান জলাধার সম্পূর্ণ শুকিয়ে 'ডে জিরো' পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিলেও এখনও শহরটির জলসঙ্কট কাটেনি।
প্রভাব: চেন্নাইয়ের ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের নোনা জল মাটির নিচে প্রবেশ করছে, ফলে নলকূপের জলও পানের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
৫. মুম্বই ও কলকাতা: মুম্বইয়ে জল সরবরাহকারী ৭টি প্রধান হ্রদে ব্যবহারযোগ্য জলের পরিমাণ হ্রাস পেয়ে মোট ধারণক্ষমতার মাত্র ৯% থেকে ১০.৩৫%-এ নেমে এসেছে। এই মজুত জল দিয়ে আর মাত্র ৩০ থেকে ৪০ দিন মায়ানগরীর তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব, যার ফলে প্রশাসন ইতিমধ্যেই শহরজুড়ে কঠোর জল রেশনিং ও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
উপকূলবর্তী শহরের নতুন সঙ্কট বর্তমানে মুম্বইয়ের জলাধারগুলির ধারণক্ষমতা ১৫%-এর নিচে নেমে যাওয়ায় জল সরবরাহ কমাতে করতে হচ্ছে। মুম্বইবাসীর সমস্ত আশা-ভরসা টিকে রয়েছে আবহাওয়া দফতরের (IMD) নতুন বর্ষার পূর্বাভাসের ওপর।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমুদ্রের জলকে মিষ্টি করার প্রজেক্ট (Desalination Plant) এবং বর্জ্য জল শোধনাগারের আধুনিকীকরণ না করলে আগামী বছরগুলিতে মুম্বইয়ের এই সঙ্কট আরও স্থায়ী রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, কলকাতায় আর্সেনিক দূষণ এবং মাত্রাতিরিক্ত জল তোলার কারণে ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত নামছে।
১. ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি: দূষিত ও অসুরক্ষিত জল পানের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। জলসঙ্কটের ফলে টাইফয়েড, জন্ডিস ও চর্মরোগের প্রকোপ কয়েক গুণ বাড়ছে।
২. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও 'ওয়াটার মাফিয়া': সরকারি সরবরাহ না থাকায় সাধারণ মানুষকে আয়ের একটা বড় অংশ বেসরকারি ওয়াটার ট্যাঙ্কার কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে 'ট্যাঙ্কার মাফিয়া', যারা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে জল বিক্রি করছে।
৩. কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস: ভারতের প্রধান জলাধারগুলিতে জলের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৫০%-এর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ কাজ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি বড় ধাক্কা খাচ্ছে।
৪. বাস্তুসংস্থান বা পরিবেশের ক্ষতি: জলাভূমি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ায় শহরের তাপমাত্রা বাড়ছে, যা তাপপ্রবাহ বা 'হিট ওয়েভ'-কে আরও মারাত্মক করে তুলছে।
বাঁচার উপায় ও সরকারি পদক্ষেপসঙ্কট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার Jal Jeevan Mission (Urban) এবং 'অটল ভূজল যোজনা'-র মাধ্যমে কাজ করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য প্রয়োজন:
বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting): প্রতিটি বাড়ি ও সরকারি আবাসন চত্বরে বৃষ্টির জল মাটির নিচে পাঠানোর পরিকাঠামো বাধ্যতামূলক করা।
বর্জ্য জলের পুনর্ব্যবহার: বর্তমানে শহরের মাত্র ২৮% বর্জ্য জল শোধন করা হয়। এটিকে বাড়িয়ে শিল্প ও বাগানের কাজে ব্যবহার বাড়াতে হবে।
স্পঞ্জ সিটি (Sponge City) মডেল: চিনের আদলে শহরের রাস্তা ও ফুটপাথ এমনভাবে তৈরি করা যাতে জল সহজেই মাটির নিচে চুইয়ে যেতে পারে।