
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের জয়ের (Bangladesh Elections Results) বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ছিল বাংলাদেশ জামাত ইসলামি (Bangladesh Jamaat-e-Islami)। নির্বাচনের আগে ঢাকার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা স্বাধীনতার পর থেকে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী পারফরম্যান্স সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে কথা বলেছিলেন। দলটি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা কেবল অংশগ্রহণের জন্য নয়, বরং ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত। তবুও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি যখন বিজয় ঘোষণা করে এবং বিদেশি সরকারগুলি অভিনন্দন বার্তা জারি করে। তখন জামাত স্পষ্টতই ভিন্ন সুরে কথা বলে। শুক্রবার ভোটের একদিন পর দলটি বলে যে ফলাফল প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নয়। আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
রাজনৈতিক গতি বিএনপির বলে মনে হচ্ছে। ২০২৪ সালের প্রাণঘাতী বিদ্রোহের পর প্রথম নির্বাচনে বিএনপি একটি নির্ণায়ক জয় দাবি করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন করেছিল। এর নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রস্তুত। চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস রহমান এবং বিএনপিকে ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে।
জামাতের জন্য ফলাফল প্রত্যাশার বিপরীত
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের পরপরই জামাতকে ব্যাপকভাবে সাংগঠনিক গতিশীলতাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লিগ সরকারকে উৎখাতের মাধ্যমে রাজপথের বিক্ষোভে দলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। আওয়ামী লিগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধ করা এবং এর নেতৃত্ব ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার ফলে, রাজনৈতিক ক্ষেত্র উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়ে যায়। তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় প্রবেশ তুলনামূলকভাবে দেরিতে হয়েছিল। কিছু সময়ের জন্য জামাত সেই থেকে উপকৃত হয়েছিল, যেখানে বিএনপির প্রচার পরিকাঠামো এখনও পুরোপুরি একত্রিত হয়নি এমন নির্বাচনী এলাকায় সমর্থন একত্রিত করেছিল তারা। কিন্তু সেই প্রাথমিক সুবিধা অস্থায়ী প্রমাণিত হয়েছে। জামাত যে ভোটারদের ভোট পাবে বলে আশা করেছিল, তারা অন্যত্র চলে গিয়েছে। তরুণ বাংলাদেশিরা, যাদের অনেকেই জুলাইয়ের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা জামাতের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তবে, মহিলা ভোটাররা জামাতের দিকে যাননি। হিন্দু সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটও বিএনপির খাতায় গিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আওয়ামী লিগের ভোটাররা জামাতে ভোট দেননি। বরং তারা বিএনপিতে চলে গিয়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফ্যাক্টর
বিএনপির সিনিয়র নেতা এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে একটি নির্বাচনী রোডশো চলাকালীন অভিযোগ করেছিলেন যে জামাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গোপন সমঝোতা করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, এ ধরনের যে কোনও ব্যবস্থা বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জামাত আনুষ্ঠানিক কোনও চুক্তি নিশ্চিত করেনি। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠককে নিয়মিত আলোচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে দলটি।
কট্টরপন্থী
১৯৪১ সালে ইসলামি স্কলার সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামাতে ইসলামি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। এর নেতারা রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শামসের মতো আধাসামরিক গোষ্ঠী গঠনে জড়িত ছিল, যাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের হত্যা, লক্ষ লক্ষ নারী ধর্ষণ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে অত্যাচারের অভিযোগ ছিল। স্বাধীনতার পর, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহারের অভিযোগে ১৯৭২ সালে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭৯ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। জামাত পরবর্তীতে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়।
হিংসার ইতিহাস
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে জামাত নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। মতিউর রহমান নিজামি এবং আলি আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মতো সিনিয়র ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্ট জামাতের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে। এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির এই সময়কালে সক্রিয় ছিল। তারা মাদ্রাসাগুলিকে প্রভাবিত করেছিল। জামাত ১৫ বছর রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিদ্রোহের পর সেই বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে। জামাত পুনর্গঠিত হয়, আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে পুনঃপ্রবেশ করে এবং নিজেদের বিদ্রোহপন্থী এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে। তারা সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রচার করে। শুধু তাই নয়, প্রথমবার কোনও হিন্দুকে প্রার্থী ঘোষণা করে। তবে, সেব কিছুই কাজে লাগেনি। জামাতের শরিয়া-ভিত্তিক আইনের পক্ষে সমর্থন, নারী অধিকার সংস্কারের অতীত বিরোধিতা, ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক হিংসা, আগের আক্রমণ নিয়ে সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ এবং নেতাদের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ জনসাধারণের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। তারা জামাতকে বিশ্বাস করতে পারেনি।