
গোটা বিশ্ব আর পশ্চিম এশিয়ার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে নতুন খবর সামনে এল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্ট বলছে, ইরানের দেওয়া ৭ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন আধিকারিকদের উদ্ধৃত করে ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) পর ইরানে ফের বোমা হামলা শুরুর কথা ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছেন ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ইরানকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার খোলাখুলি হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। তার পরেই এই খবর সামনে এল।
গত ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ সভায় ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমাকে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইরানের সঙ্গে কি এমন কোনও চুক্তি হবে, যাতে ওরা নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে পারে? হয়তো মধ্যপ্রাচ্য বা গোটা বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশ হয়ে উঠতে পারে। নাকি আমি ইসলামিক রিপাবলিককে খুব দ্রুত নিশ্চিহ্ন করে দেব, যাতে ওরা আর কখনও মানুষ বা অন্য দেশকে ধ্বংস করার সুযোগ না পায়? তবে আমার মনে হয়, নির্বাচনের ঠিক পরেই আমরা একটা চুক্তিতে আসব। কারণ চুক্তি না করাটা ওদের জন্য বোকামি হবে।"
বৃহস্পতিবারই ইরানের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত মেটাতে ৭ দিনের একটা পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এই পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরুর কথা বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় সাংবাদিকদের আরাগচি জানান, চলতি বছরের জুনে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে মউ (MoU) সই হয়েছিল, এই প্রস্তাবটা অনেকটা সেরকমই। তিনি বলেন, "মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমরা আমেরিকাকে একটা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছি। কিছু শর্ত মানা হলে, সপ্তম দিনের শেষে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে এবং আলোচনা ফের শুরু হবে... আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কোনও চুক্তি হলে সেটা সবার জন্যই ভালো হত।"
জার্মানির বিদেশমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুলের সঙ্গে বৈঠকেও আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, কূটনীতির পথে এগোতে ইরান তাদের যৌক্তিক শর্ত ও চাহিদার কথা আমেরিকাকে জানিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ফেরাতে হলে ইরানের ওপর আমেরিকার আগ্রাসী ও হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ বন্ধ হওয়া দরকার।
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আরও জানান, তাদের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কূটনীতির পথেই হাঁটতে চায় ইরান। তিনি মনে করিয়ে দেন, আলোচনার টেবিলে ইরানের সদিচ্ছাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। উল্টে আলোচনার মাঝেই ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইজরায়েল সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে, আর হরমুজ প্রণালীতে অশান্তির জন্য ইরানকে দায়ী করেছে।
এদিকে, ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আমেরিকাকে দুষেছেন। চলতি বছরের জুনে দু'পক্ষের মধ্যে যে রফা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত না হওয়ার জন্য আমেরিকাই দায়ী বলে দাবি তাঁর।
ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, "আপনাদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমরা একটা চুক্তিতে পৌঁছেছিলাম। সেটা সইও হয়েছিল। তার ভিত্তিতেই আমরা এগোতে চেয়েছিলাম এবং এখনও চাই। একটা রূপরেখাও ঠিক হয়েছিল। আমরা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করিনি; সেটা খোলাই ছিল। কোনও আইনি কারণ ছাড়াই... ওরা আমাদের ওপর হামলা চালাল। ওরা আমাদের শ্রদ্ধেয় সুপ্রিম লিডারকে হত্যা করে শহিদ করেছে; আমাদের বিজ্ঞানী, সামরিক কমান্ডার ও সরকারের ওপর হামলা করেছে। সমস্যাটা হল, আমেরিকা আলোচনার বদলে প্রথমেই আমাদের ওপর বোমা ফেলে ময়দানে নামছে, সব রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছে। আমরা কিন্তু প্রস্তুত।" এখন, ট্রাম্প যেহেতু ইরানের এই শান্তির প্রস্তাব খারিজ করে দিলেন, তাই আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন মিটলেই পশ্চিম এশিয়ায় উত্তাপ যে আরও বাড়বে, তা একপ্রকার নিশ্চিত।