
মার্কিন মিডিয়ার রিপোর্ট বলছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চিন সফর ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে তাঁর কৌশলগত সিদ্ধান্তকে অনেকটাই প্রভাবিত করছে। এনবিসি-র খবর অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, সামরিক ও কূটনৈতিক বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখার সময় প্রেসিডেন্টের মাথায় তাঁর চিন সফরের বিষয়টিও রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা এনবিসি-কে আরও জানান, আগামী ১৪ ও ১৫ মে নির্ধারিত বেইজিং সফরকে এখন ‘অগ্রাধিকার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকা এই সফর পিছিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু প্রশাসন আর এই সফর বাতিল করতে চাইছে না।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ রিপোর্ট করেছে যে, হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের বিভিন্ন বন্দরে দ্বিমুখী সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এই ‘হাই-স্টেকস’ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরের আগে এই বিষয়গুলি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেইজিং প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে তারা যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ নিতে আগ্রহী। তবে, মার্কিন আইনের উল্লেখ করে ইরানের তেল কেনাবেচার অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকটি চিনা শিপিং ফার্ম এবং তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে, যা উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
এই অঞ্চলের শক্তি নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ চিনের মতো তার অনেক প্রতিবেশী দেশই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেল সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মার্চ মাসের শুরু থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি প্রায় বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন প্রভাবিত হয়েছে এবং আসন্ন দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ওপর চাপ বাড়ছে।
এই আন্তর্জাতিক চাপের আবহে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর প্রশাসনের মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া এই আলোচনার আসল পরিস্থিতি সম্পর্কে কেউ জানে না। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমি এবং আরও দু-একজন ছাড়া এই আলোচনার ব্যাপারে আর কেউ কিচ্ছু জানে না।”
প্রেসিডেন্ট ইরানের নেতৃত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করে বলেন, “একটা সমস্যা আছে, কারণ কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না যে নেতা কারা। এটা একটা ছোট সমস্যা।”
এইসব সমস্যা সত্ত্বেও ট্রাম্প দাবি করেন যে তেহরান “ভীষণভাবে” একটি চুক্তি চাইছে। তিনি যুক্তি দেন যে মার্কিন চাপের কৌশল ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অবরোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ওদের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। এই অবরোধ অবিশ্বাস্য। অবরোধের শক্তি অবিশ্বাস্য।”
অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও, বর্তমানে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইরানের ওপর বড় আকারের সামরিক হামলা পুনরায় শুরু করার সম্ভাবনাকে তেমন গুরুত্ব দেননি। নতুন করে “বোমাবর্ষণ”-এর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না এটার দরকার আছে। তবে হয়তো লাগতেও পারে।” সিএনএন-এর মতে, তেহরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে চাপ বজায় রাখার জন্য পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে ইরানের জন্য আপডেট করা সামরিক বিকল্প জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে, প্রেসিডেন্ট দেশের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন। সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা সীমিত করার জন্য কংগ্রেসের বারবার প্রচেষ্টার সমালোচনা করে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “ওরা বারবার যুদ্ধ ক্ষমতার প্রসঙ্গ তোলে... আমি ইরানের সঙ্গে একটা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছি... আর প্রতি সপ্তাহে, প্রতি তিন দিন অন্তর ওরা বলে যুদ্ধ থামাতে হবে।”
এই অভ্যন্তরীণ আইনি বিতর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ সেনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির সামনে প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষে সওয়াল করে বলেন যে, বর্তমান যুদ্ধবিরতির কারণে ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’-এর সময়সীমা থেমে গেছে।
এই আইন অনুযায়ী, সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে কংগ্রেসকে জানানোর পর একজন প্রেসিডেন্টের কাছে ৬০ দিন সময় থাকে অভিযান শেষ করার বা কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার জন্য। ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা চলতি সপ্তাহের শেষে শেষ হওয়ার কথা।
সিএনএন-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, শুনানির সময় হেগসেথ বলেন, “শেষ পর্যন্ত, আমি এই বিষয়ে হোয়াইট হাউস এবং হোয়াইট হাউস কাউন্সেলের ওপর নির্ভর করব; তবে, আমরা এখন যুদ্ধবিরতিতে আছি, যার মানে আমাদের মতে ৬০ দিনের ঘড়িটি যুদ্ধবিরতির সময় থেমে যায় বা বন্ধ থাকে।”
এই ব্যাখ্যার তীব্র বিরোধিতা করেছে বিরোধী পক্ষ। ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর টিম কেইন প্রশাসনের এই মতের বিরোধিতা করে বলেন: “আমার মনে হয় না আইন এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে।” কেইন আরও বলেন যে আসন্ন এই সময়সীমা “প্রশাসনের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তৈরি করতে চলেছে।”