তেলের সংকট শুধু হরমুজ প্রণালীর অবরোধের জন্যই তীব্র হচ্ছে না, এর পিছনে রয়েছে বিভিন্ন শক্তি কেন্দ্রে হওয়া হামলাও। নয়টি দেশের মোট ৩৯টি শক্তি কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সংকট তীব্র হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায়, খুব কম তেলের ট্যাঙ্কারই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা হরমুজ প্রণালী দখল করে ইরানের অবরোধ ভাঙার কথা ভাবছে। এর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো দেশগুলির সাহায্য চাইলেও, বেশিরভাগ দেশই এই সংঘাতে জড়াতে চাইছে না। তবে নতুন তথ্য বলছে, শুধু হরমুজ প্রণালীর অবরোধই এখন বিশ্বের মূল সমস্যা নয়।
26
৯টি দেশে ৩৯টি কেন্দ্রে হামলা
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি তদন্তে জানা গিয়েছে, ৯টি দেশের মোট ৩৯টি শক্তি কেন্দ্রে হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে তেল শোধনাগার, প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্র এবং অন্যান্য শক্তি কেন্দ্রও রয়েছে। এই ক্ষতিগ্রস্ত তেল ও গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রগুলির মেরামত করে আবার চালু করতে কত সময় লাগবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, এটাই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই হামলাগুলি তেল উৎপাদনে বড় সংকট তৈরি করেছে। কোথাও ড্রোন দিয়ে, আবার কোথাও মিসাইল দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। অনেক জায়গায় একাধিকবার হামলা হয়েছে।
36
যুদ্ধের অন্যতম অস্ত্র জ্বালানি
এই সমস্যা দুই পক্ষকেই দু'ভাবে প্রভাবিত করছে। জ্বালানি শোধনাগারগুলি ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের প্রশাসন চালাতে এবং বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে তারা মূলত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপরই নির্ভর করে। অন্যদিকে, আমেরিকার জন্য তেলের বাজারে সংকটই প্রধান হুমকি। আমেরিকা চাইছে জ্বালানির দামের বৃদ্ধি রুখতে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভিতকে রক্ষা করতে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, দুই পক্ষই শক্তি সংকটকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের জোগান কয়েক মাস ধরে বন্ধ থাকায় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বৃহস্পতিবার সকালে ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে এর দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৭৩ ডলারের কম।
টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের শক্তি কেন্দ্রগুলিতে কমপক্ষে ৪৭টি হামলা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান না থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। বুধবার ইজরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে পাল্টা হামলা করেছে। শুধু এই সপ্তাহেই প্রায় দশটি শক্তি কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কাতারের একটি ফুয়েল হাব, এবং কুয়েত, সৌদি আরব ও ইজরায়েলের তেল শোধনাগারও রয়েছে। হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল পাঠানোর জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও সৌদির যে অয়েল এক্সপোর্ট টার্মিনালগুলি রয়েছে, সেগুলিও এখন হুমকির মুখে। এই সপ্তাহে আমিরশাহির এমনই একটি কেন্দ্রে হামলা হয়েছে। সৌদির একটি কেন্দ্রের কাছের রিফাইনারিতেও ড্রোন হামলা হয়।
56
কাতারে বড়সড় ক্ষতি
এই হামলাগুলি শুধু তেলের দাম বাড়ায়নি। বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি কেন্দ্র, কাতারের রাস লাফান সেন্টারেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন কাতার এনার্জি কোম্পানির এই কেন্দ্রে প্রাকৃতিক গ্যাসকে ঠান্ডা করে তরল অবস্থায় এনে ট্যাঙ্কারে পাঠানো হয়। যুদ্ধের তৃতীয় দিনেই কাতার জানিয়েছিল যে তারা এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার কাতার এনার্জি জানিয়েছে, এই সপ্তাহের হামলায় দেশের এলএনজি রফতানি ক্ষমতার ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই ক্ষতি মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এলএনজি সংকটের মূল কারণ হল এর কোনও বিকল্প নেই। অন্য দেশগুলিতে এর জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতাও নেই, যা সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
66
সংকট মেটাতে মরিয়া বিশ্ব
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের আপৎকালীন ভান্ডার থেকে তেল ছাড়তে রাজি হয়েছে। একইসঙ্গে, হরমুজ প্রণালীর বাধা দূর করতে আমেরিকান সেনা ইরানের জাহাজ ও ড্রোনের ওপর হামলা চালাচ্ছে। রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।আমেরিকা ইরানের তেলের ওপর থেকেও সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।