
ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের একটি ভিডিও সম্প্রচারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক স্তরে বড়সড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, গাজাগামী জাহাজে থাকা আন্তর্জাতিক সমাজকর্মীদের সঙ্গে অবমাননাকর আচরণ করছে ইজরায়েলি বাহিনী। এই ঘটনার প্রতিবাদে সাতটি ইউরোপীয় দেশ-সহ মোট দশটি দেশ তাদের রাজধানীতে থাকা ইজরায়েলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে।
কানাডা, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং পোল্যান্ড—এই দেশগুলো একযোগে এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি ইজরায়েলি নৌবাহিনী 'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা' নামের গাজাগামী জাহাজটিকে আটক করার পর থেকেই উত্তেজনা বাড়ছিল।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ একটি পোস্ট করে অটোয়ার এই কড়া পদক্ষেপের কথা জানান। কার্নি বলেন, "কানাডার বিদেশমন্ত্রী আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছেন ইজরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ওই জাহাজে থাকা কানাডার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আশ্বাস চাইতে।" ভিডিওতে রেকর্ড হওয়া ঘটনা এবং এর নেপথ্যে থাকা ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের তীব্র নিন্দা করে কার্নি জানান, এই কট্টরপন্থী ইজরায়েলি আধিকারিকের বিরুদ্ধে কানাডা ইতিমধ্যেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
কার্নি জোর দিয়ে বলেন, "বারবার হিংসায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে কানাডা আগেই মিস্টার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা।"
আল জাজিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই মানবিক ত্রাণবাহী জাহাজে ১১ জন কানাডার নাগরিক ছিলেন। জাহাজটিকে আটক করার সময় তাঁরা সেখানেই ছিলেন বলে মিশনের আয়োজকরা নিশ্চিত করেছেন।
এই আন্তর্জাতিক ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে বেন-গভিরের নিজেরই প্রকাশ করা একটি ভিডিও। সেখানে দেখা যাচ্ছে, এই দক্ষিণপন্থী মন্ত্রী প্যালেস্তাইন-পন্থী স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে মশকরা করছেন। সোমবার আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে জাহাজটি আটক করার পর সমাজকর্মীদের প্লাস্টিকের টাই দিয়ে বেঁধে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা হয়।
এই ষাট সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটি প্রকাশ পেতেই তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে এবং আটক হওয়া ত্রাণবাহী জাহাজটির দিকে সকলের নজর যায়। জাহাজটিতে ৪৪টি দেশের ৪২৮ জন শান্তিকর্মী ছিলেন। ২০০৭ সাল থেকে গাজা স্ট্রিপের উপর চাপানো অবরোধ ভাঙার একটি নাগরিক প্রচেষ্টা হিসেবে গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের মারমারিস থেকে তাঁরা যাত্রা শুরু করেছিলেন।
সমাজকর্মীদের সঙ্গে এমন আচরণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ইউরোপের রাজধানীগুলো দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়। ইতালির বিদেশ মন্ত্রক ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায় এবং তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে দেশে ফেরানোর দাবি করে। সেক্রেটারি-জেনারেল অ্যাম্বাসাডর রিকার্ডো গুয়ারিগ্লিয়া রোমের তরফে এই ঘটনার "তীব্র প্রতিবাদ" জানান।
একই সঙ্গে, ওয়ারশ ঘোষণা করে যে পোল্যান্ডের রাজধানীতে থাকা ইজরায়েলের চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হবে। বিদেশমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি বলেন, ইজরায়েলি মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের "অত্যন্ত অনুচিত আচরণের" বিরুদ্ধে ওয়ারশ-র "তীব্র ক্ষোভ" জানাতেই এই পদক্ষেপ।
এই কূটনৈতিক চাপ দ্রুত মাদ্রিদেও ছড়িয়ে পড়ে। স্পেন সরকার ইজরায়েলের চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে। এর আগে স্পেনের বিদেশমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস আটক সমাজকর্মীদের সঙ্গে হওয়া আচরণকে "দানবীয়, অমানবিক এবং লজ্জাজনক" বলে প্রকাশ্যে নিন্দা করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রমাণে দেখা যাচ্ছে যে ইজরায়েলের একজন মন্ত্রী এবং নিরাপত্তা বাহিনী স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে "অন্যায় ও অপমানজনকভাবে" আচরণ করছে।
প্যারিসও একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়। বিদেশমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো-র মতে, এই ঘটনায় "তীব্র ক্ষোভ" জানাতে ফ্রান্স ইজরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। ফরাসি সরকার তেল আবিবের কাছে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
ইউরোপীয় চাপ আরও বাড়িয়ে বেলজিয়াম সরকার ইজরায়েলের কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে ডেকে বেন-গভিরের "গভীরভাবে উদ্বেগজনক" এবং "অগ্রহণযোগ্য" কাজের জন্য তীব্র আপত্তি জানায়। পাশাপাশি, আটক সকল কর্মীর অবিলম্বে মুক্তির দাবি করে। বিদেশমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রিভোট মন্তব্য করেন, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে মানবাধিকার কর্মীদের "বন্দি করে, বেঁধে, মুখ নিচু করে" রাখা হয়েছে, আর একজন সরকারি কর্মকর্তা সেই অবমাননার দৃশ্য সম্প্রচার করছেন।
ডাচ বিদেশ মন্ত্রকও একই পথে হেঁটেছে। হেগ-এ থাকা ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়। ডাচ বিদেশমন্ত্রী বুধবার 'গ্লোবাল সুমুদ' ত্রাণকর্মীদের সঙ্গে হওয়া আচরণকে "মর্মান্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য" বলে অভিহিত করেন।
লিসবনও বেন-গভিরের কাজের তীব্র নিন্দা করেছে। পর্তুগালের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা ইজরায়েলের চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্সকে ডেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং এই অভিযানের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
এই কূটনৈতিক ক্ষোভ ইউরোপ ছাড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও পৌঁছেছে। ওয়েলিংটনও ইজরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করার কথা জানায়। বিদেশমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স উল্লেখ করেন যে নিউজিল্যান্ড গত বছরই বেন-গভিরের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে "শান্তি ও নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে মুছে ফেলার" অভিযোগ ছিল।
ক্যানবেরায়, বিদেশমন্ত্রী পেনি ওং নিশ্চিত করেছেন যে অস্ট্রেলিয়ায় ইজরায়েলের শীর্ষ কূটনীতিককেও বিদেশ ও বাণিজ্য দপ্তরে তলব করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রীর আটক ব্যক্তিদের ব্যঙ্গ করার ভিডিও ফুটেজ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারের তীব্র অসন্তোষ জানাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।