
নেপালের রাসুওয়াগধি জেলায় চিন সীমান্তের কাছে ভোটকোশি নদীতে আছড়ে পড়েছে ভয়াবহ হড়পা বান। এই বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনও ৯১০ জনের কোনো খোঁজ মেলেনি বা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার জোরকদমে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালানো হয়। মৃতের সংখ্যা কতটা বাড়বে তাই নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে প্রশাসনের। কারণ কাদা পার হয়ে উদ্ধারকাজ রীতিমত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর ২টো পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে চিতওয়ান জেলায়। সেখানে ১০৮টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যান্য জেলাগুলির মধ্যে ধাডিংয়ে ২৭ জন, নুওয়াকোটে ১২, রাসুওয়াতে ২, গোর্খায় ২০, পূর্ব নওয়ালপারাসিতে ৬২, তানাহুনে ১২ এবং পশ্চিম নওয়ালপারাসিতে ১৫ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে।
যে ৯১০ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, তাঁদের মধ্যে ২৮ জন নেপাল পুলিশ, ৪৪ জন নেপাল সেনা, ১৩ জন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, ১৫ জন কাস্টমস অফিস এবং ৪ জন ইমিগ্রেশন অফিসের কর্মী রয়েছেন।
ডিস্ট্রিক্ট ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (DEOC) জানিয়েছে, শুধুমাত্র রাসুওয়া জেলাতেই ১৬১ জন নিখোঁজ। এছাড়া নুওয়াকোট থেকে ১ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর মিলেছে।
এই বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন বহু বিদেশি নাগরিকও। অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নিখোঁজ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এছাড়া, বিদেশে বসবাসকারী ১২৭ জন নেপালি নাগরিক, যাঁরা দেশে বেড়াতে এসেছিলেন, তাঁদেরও খোঁজ মিলছে না।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ঘটনায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৪৩ জন রাসুওয়া এবং ৩ জন ধাডিংয়ের বাসিন্দা।
বুধবার রাসুওয়াগধির কাছে ভোতেকোশি এলাকায় এই হড়পা বান আছড়ে পড়ার পরেই ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে বড় আকারের তল্লাশি, উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান শুরু হয়।
এদিকে, ভারতের বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে যে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় নেপালে যাওয়া তামিলনাড়ুর ২১ জন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, উদ্ধার হওয়া দলটিকে কাঠমান্ডুতে নিয়ে আসা হচ্ছে। সেখান থেকে তাঁদের ভারতে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে।
জয়সওয়াল বলেন, "আজ দুপুর ১টা পর্যন্ত আমরা ২১ জন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করতে পেরেছি। এই দলটি তামিলনাড়ুর বাসিন্দা।" তিনি আরও জানান, কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ওই দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।
বিদেশমন্ত্রক আরও জানিয়েছে, চিনের দিকে আটকে পড়া প্রায় ২০০ জন ভারতীয় নাগরিক উদ্ধারের জন্য ভারতের কাছে সাহায্য চেয়েছেন।
জয়সওয়াল বলেন, "বেজিংয়ে আমাদের দূতাবাস তাঁদের নিরাপদে উদ্ধারের জন্য সবরকম চেষ্টা চালাচ্ছে। সেখানে প্রায় ২০০ জন ভারতীয় আমাদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন।" এঁদের মধ্যে ৯৫ জন ভারতীয় দারচানে রয়েছেন এবং তাঁরা বাইশা হয়ে নেপালে ঢোকার চেষ্টা করছেন। ৪ জন জিলং শহরে এবং ১৩ জন জুতুলপুক থেকে সাগার দিকে এগোচ্ছেন।
মুখপাত্র আরও জানান, নেপালে এখনও ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
এই নিখোঁজদের মধ্যে ত্রিশূলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৭৩ জন ভারতীয় রয়েছেন। কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস প্রকল্পের প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
অন্যান্য দলগুলির মধ্যে রয়েছে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া তামিলনাড়ুর ৩৭ এবং ৪৯ জনের দুটি দল; রাসুওয়া জেলার তিমুরে থাকা পশ্চিমবঙ্গের ৩২ জন পর্যটক; রিচা ট্যুরসের মাধ্যমে যাওয়া বিভিন্ন রাজ্যের ৬১ জন এবং কেরালার ৩৩ জন নাগরিক।
জয়সওয়াল বলেন, "ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিপর্যস্ত, তাই সেখানকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।"
ভারত সরকার বন্যাদুর্গত ভারতীয়দের সাহায্য করতে এবং যোগাযোগের সুবিধার্থে বিদেশমন্ত্রকে একটি ২৪x৭ বিশেষ কন্ট্রোল রুম খুলেছে। নেপালে উদ্ধারকারী দলগুলি নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে এবং দুর্গতদের ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। অন্যদিকে, কাঠমান্ডু ও বেজিংয়ে ভারতীয় দূতাবাসগুলি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ভারতীয় নাগরিকদের খুঁজে বের করতে ও সাহায্য করতে কাজ করে চলেছে।