
সোশ্যাল মিডিয়ায় নেপালের ভয়াবহ ধসের একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, হিমালয়ের খাড়া পাহাড়ের একটা বড় অংশ হঠাৎ করেই ধসে পড়ছে। মাটি, পাথর আর গাছপালা হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে, মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে আস্ত একটা পাহাড় যেন গায়েব হয়ে গেল!
নেপালে গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টি, বন্যা আর ধস চলছে। এর মাঝেই এই ভিডিওটা ছড়িয়ে পড়েছে। জানা গেছে, ভিডিওটা মানাং জেলার চাম এলাকার। সেখানে ধসের কারণে মার্সিয়াংদি নদীর গতিপথ আটকে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন নদীর আশেপাশের এলাকার মানুষদের সতর্ক থাকতে বলেছে।
Terrifying: Entire mountain collapses in seconds in Nepal's Manang
One moment the mountain is standing. The next, it's gone. Rock, mud and trees crash down all at once, with nothing anyone can do but watch.
Praying for everyone there.
For those of us in the hills, this is a… pic.twitter.com/epw77zrUJX— Kumaon Jagran (@KumaonJagran) September 28, 2026
এই হাড়হিম করা দৃশ্য দেখে নেটিজেনরাও চমকে গেছেন। এত দ্রুত একটা পাহাড় কীভাবে ধসে পড়তে পারে, তা দেখে অনেকেই অবাক।
ক্যামেরায় ধরা পড়ল ভয়াবহ ধস
ভিডিওর শুরুতে দেখা যায়, পাহাড়ের একটা খাড়া অংশ বেশ শান্তই ছিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মাটি আর পাথর খসতে শুরু করে। এরপর বিশাল একটা অংশ হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে আসে।
মাটি আর পাথর হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে আসে। ধুলোয় ঢেকে যায় চারপাশ। ধস নামার এই গতি আর বিশালতা দেখেই শিউরে উঠছেন সবাই।
A massive landslide has struck Nepal and the footage is hard to believe
It looks like an entire mountain collapsed in seconds pic.twitter.com/P3vUPZMj6X— Surajit (@surajit_ghosh2) September 28, 2026
ভিডিওটা দেখে অনেকেই বলছেন, তারা ওই জায়গায় থাকলে ভিডিও না করে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পালাতেন। একজন লিখেছেন, ওখানে দাঁড়িয়ে ভিডিও করাটা চরম বোকামি। আরেকজন লিখেছেন, দৃশ্যটা খুবই মর্মান্তিক, আশা করি ওই এলাকার সবাই নিরাপদে আছেন।
অনেকেই আবার পাহাড়ের মাটি কতটা আলগা হয়ে গেছে, তা নিয়ে কথা বলছেন। কেউ কেউ এর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। আবার বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে যারা ভিডিও করছিলেন, তাদেরও সমালোচনা করেছেন অনেকে।
পাহাড়ি জেলা মানাংয়ে এখন একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। মানাংয়ের সদর দফতর চামে ধস নামায় মার্সিয়াংদি নদীর জলপ্রবাহ আটকে যায়। কিছুক্ষণ পর জল আবার বইতে শুরু করলেও, ধস এখনও পুরোপুরি থামেনি। তাই নদীর আশেপাশের মানুষদের চরম সতর্ক থাকতে বলেছে প্রশাসন।
An entire mountain collapsed into the Kaligandaki River in Nepal pic.twitter.com/hlE6BVQ5FF
— Surajit (@surajit_ghosh2) September 28, 2026
হিমালয়ের খাড়া ঢাল আর টানা বৃষ্টির কারণে নেপালের অনেক জায়গায় এখন চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চাম এলাকায় আশেপাশের পাহাড়গুলো থেকে বারবার ধস নামছে। তাই স্থানীয় বাসিন্দা আর প্রশাসনকে সবসময় সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
নেপালের আরও অনেক জেলাতেই এখন এই একই রকম দুর্যোগ চলছে।
ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA) জানিয়েছে, ২৪ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে টানা বৃষ্টি, বন্যা আর ধসে নেপালে ২০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন ধসের কারণে। ধসে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে আর ৫ জন নিখোঁজ। বন্যায় মারা গেছেন ৪ জন। আর টানা বৃষ্টির কারণে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এই দুর্যোগে ২৪৭টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ২৬০টি বাড়ি পুরোপুরি ভেঙে গেছে আর ৮০টি বাড়ির আংশিক ক্ষতি হয়েছে। বিপদ বুঝে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে।
রাস্তাঘাটও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ধসের কারণে চিতওয়ান যাওয়ার বেশ কয়েকটা হাইওয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। নিচু এলাকার মানুষদের আরও বন্যার বিষয়ে সতর্ক করেছে প্রশাসন।
NDRRMA জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া নিম্নচাপের জেরে নেপালের অনেক জায়গায় এই চারদিন ধরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে।
বৃষ্টির পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। দেশের ১০৬টি জায়গায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
নওয়ালপরাসির দুমকুয়ালিতে ৪৫৫.২ মিমি, পোখরায় ৪০৭.২ মিমি এবং তনহুঁর আনবু খাইরেনিতে ৩৭৩.২ মিমি বৃষ্টি হয়েছে।
দার্জিলিং বা কালিম্পংয়ের মতো পাহাড়ি এলাকায় যেমন টানা বৃষ্টিতে মাটি আলগা হয়ে যায়, ঠিক তেমনই নেপালের এই খাড়া পাহাড়গুলোতেও টানা বৃষ্টির জেরে ধসের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে গেছে। ধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে হঠাৎ বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এই বিপদের কথা মাথায় রেখেই বড় নদীগুলোর আশেপাশের মানুষদের জন্য হাই-অ্যালার্ট জারি করেছে NDRRMA।
বিপদ শুধু রাস্তা বা বাড়িঘরের নয়।
চাম এলাকায় ধসের কারণে মার্সিয়াংদি নদী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে মুস্তাংয়ে ধস নেমে কালীগণ্ডকী নদীর গতিপথ আংশিকভাবে আটকে গেছে। নদীর জল হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে, তাই ভাটির দিকের মানুষদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
অন্যান্য জায়গাতেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
স্যাংজার মিরমির সঙ্গে গুলমির হারমিচৌরের যোগাযোগকারী একটা সেতু কালীগণ্ডকী নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। নেপালের হিন্দুস্থান সমাচার জানিয়েছে, রবিবার সকাল ৬টা নাগাদ কালীগণ্ডকী 'এ' জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে জলের তোড় বেড়ে যাওয়ায় চার চাকার গাড়ি চলাচলের ওই বেইলি ব্রিজটি ভেসে যায়।
এর ফলে মিরমি আর হারমিচৌরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে জরুরি উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। জাজারকোট, ম্যাংদি আর শঙ্খুয়াসভায় রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় আটকে পড়া মানুষদের হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হচ্ছে।
পর্যটক আর ট্রেকারদের জন্যও সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। NDRRMA-র হিসেব অনুযায়ী, এই ভারী বৃষ্টির সময় নেপালে প্রায় ৯ হাজার বিদেশি পর্যটক আর ট্রেকার ছিলেন। যারা বিপজ্জনক এলাকায় আছেন, তাদের আপাতত যাত্রা স্থগিত রেখে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বলা হয়েছে।
উঁচু পাহাড়গুলোতেও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে।
কাঠমান্ডু পোস্টের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মানাংয়ের ৭,১২৬ মিটার উঁচু হিমলুং হিমালয়ে তুষারধস নেমেছে। এর জেরে বেশ কয়েকজন পর্বতারোহী আর তাদের সাহায্যকারী কর্মীরা নিখোঁজ হয়ে যান। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে এখনও ১২ জনের কোনও খোঁজ মেলেনি।
নেপালের এই ভাইরাল ধসের ভিডিওগুলো দেশের বর্তমান দুর্যোগ পরিস্থিতির ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ভিডিওতে দেখে মনে হচ্ছে যেন আস্ত একটা পাহাড় ভেঙে পড়ছে, তবে রিপোর্ট অনুযায়ী এটা হিমালয়ের একটা বড় অংশের ধস।
তবে বিপদ যে এখনও কাটেনি, সেটা পরিষ্কার। এই চরম আবহাওয়ার মধ্যে নেপালে একাধিক ধস, নদীর গতিপথ আটকে যাওয়া, বন্যা আর তুষারধসের ঘটনা ঘটেছে।
দেশের বেশ কিছু জায়গায় এখনও বৃষ্টি চলছে। তাই প্রশাসন বিপজ্জনক পাহাড়ের ঢাল আর নদীগুলোর ওপর কড়া নজর রাখছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।