নেপালে টানা চারদিনের প্রবল বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫ জন। দুর্গত এলাকা থেকে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নেপালে টানা চারদিনের প্রবল বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৫ জন। ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA) একটি সরকারি আপডেট দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে ভূমিধসে। ধসের কারণে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫ জন নিখোঁজ। অন্যদিকে, বন্যায় ৪ জন এবং টানা ভারী বৃষ্টির কারণে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বন্যা ধসে বিপর্যস্ত নেপাল

এই দুর্যোগে সারা দেশে ২৪৭টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৬০টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ৮০টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। NDRRMA জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া একটি নিম্নচাপের জেরে ২৪ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেপালের বিভিন্ন এলাকায় এই প্রবল বৃষ্টিপাত হয়।

জলস্তর বেড়ে যাওয়া এবং ধস নামার কারণে জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো প্রায় ৩ হাজার মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন একসঙ্গে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। তারা দুর্গত পরিবারগুলোকে খাবার ও জরুরি ত্রাণ দিচ্ছে। জাজারকোট, ম্যাংদি এবং শঙ্খুয়াসভার মতো পাহাড়ি জেলাগুলোতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে জরুরি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃষ্টির সময় নেপালে প্রায় ৯ হাজার বিদেশি পর্যটক ও ট্রেকার ছিলেন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড এবং স্থানীয় ট্রেকিং সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে NDRRMA ইংরেজিতে একটি সুরক্ষা নির্দেশিকা জারি করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রা স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে।

গত চারদিনে দেশের ১০৬টি জায়গায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে NDRRMA-এর মনিটরিং স্টেশনগুলো। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে নওয়ালপরাসির (বর্দঘাট সুস্তা পূর্ব) দুমকুয়ালিতে, ৪৫৫.২ মিলিমিটার। এরপর কাস্কির পোখরায় ৪০৭.২ মিলিমিটার এবং তনহুঁর আঁবু খাইরেনিতে ৩৭৩.২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

দুর্যোগের সময় বিপদ এড়াতে NDRRMA-এর সেন্ট্রাল মনসুন রেসপন্স কমান্ড সেন্টার স্থানীয় প্রশাসনকে ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে স্কুল ছুটি ঘোষণা করা হয়। সংস্থাটি উদ্ধারকর্মীদের কাছে ৫ হাজারেরও বেশি ডিরেক্ট এসএমএস অ্যালার্ট পাঠিয়েছে। পাশাপাশি, বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ নিচু এলাকার বাসিন্দাদের কাছে ৮ লক্ষ ১৪ হাজারেরও বেশি আগাম সতর্কতামূলক টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছে।

NDRRMA-এর মুখপাত্র শান্তি বাসনেত জানিয়েছেন, দেশের ৭৭টি জেলার প্রশাসন এবং তিনটি জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাকে হাই অ্যালার্টে রাখা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। দিনের শুরুতে দেওয়া আরেকটি আপডেটে NDRRMA প্রধান নদী অববাহিকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষদের জন্য একটি হাই-অ্যালার্ট জারি করে। ধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ায় এই সতর্কতা দেওয়া হয়।কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মানাং জেলার সদর দফতর চামেতে ধস নামার কারণে মার্সিয়াংদি নদীর জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে, মুস্তাংয়ের থাসাং গ্রামীণ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিসিতে আরেকটি ধসের কারণে কালী গণ্ডকী নদীর জলপ্রবাহ আংশিক আটকে গেছে। এই দুটি নদীর নিচের দিকের এলাকার বাসিন্দাদের চরম সতর্ক থাকতে বলেছে NDRRMA, কারণ যেকোনো সময় জল ফেটে বেরিয়ে আসার ঝুঁকি রয়েছে।

নারায়ণী নদীতে জলস্তর বৃদ্ধি

রবিবার সকালে মধ্য নেপালের নারায়ণী নদীর ধারের বাসিন্দাদের জন্য সতর্কতা জারি করে প্রশাসন। নদীর জলস্তর ৯ মিটারের বিপদসীমা পার করে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়ার অন্যতম প্রধান রাস্তা, চিতওয়ানগামী হাইওয়েগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক জায়গায় ধস নামার খবর পাওয়া গেছে। আধিকারিকদের মতে, বিভিন্ন জায়গায় ধস নামার কারণে তল্লাশি ও উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। টানা বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। সংলগ্ন বাগলুং জেলাতেও ধসে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় এক আধিকারিক এএনআই-কে নিশ্চিত করেছেন। বাগলুং জেলার নিশিখোলা গ্রাম পরিষদের ডেপুটি চেয়ারপার্সন প্রেম বাহাদুর ঘারতি মাগার ফোনে এএনআই-কে বলেন, "নিশিখোলা গ্রাম পরিষদে ধসের নিচে চাপা পড়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আজ সকালে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হারদ্রায় এই ঘটনা ঘটে।"

জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালীগণ্ডকী নদী বাড়িঘর ও সেতু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, যার ফলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যা ও জলমগ্ন হওয়ার ঝুঁকির কারণে নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন জেলায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

হিমলুং হিমালয় বেস ক্যাম্পে ধস এরই মধ্যে নেপালে আরেকটি বিপর্যয়ের খবর পাওয়া গেছে। মানাং জেলার উঁচুতে অবস্থিত হিমলুং হিমালের বেস ক্যাম্পে তুষারধসের পর দুটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নেপাল পুলিশের সদর দফতরের মাধ্যমে এক্সে (X) করা একটি পোস্টে NDRRMA নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধারকারী দল ওই উঁচু ক্যাম্পে দুজনের মৃতদেহ পেয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় কয়েকদিন ধরে ভারী তুষারপাত হচ্ছিল, যার ফলে পর্বতারোহীরা শরতের এই অভিযান থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন। রবিবারের তুষারধসে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিরা বিভিন্ন অভিযাত্রী দলের সদস্য। মানাং জেলায় ৭,১২৬ মিটার উঁচু হিমলুং হিমালে পৌঁছানোর জন্য হেলিকপ্টার ফ্লাইটের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমতির প্রয়োজন হয়, যা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।