নেপালের বিধ্বংসী বন্যার পর ভারতের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাওয়ার খবরকে জল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কাঠমান্ডু দিল্লির কাছে কোনো ক্ষতিপূরণ চায়নি। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর জলবায়ু সংক্রান্ত বিপর্যয় নিয়ে ভারতের কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার যে খবর ছড়িয়েছিল, তা পুরোপুরি অস্বীকার করলেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, কাঠমান্ডু ভারতের কাছে কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ চায়নি। ANI-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খানাল এই সংক্রান্ত সমস্ত রিপোর্ট খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে তারা প্রতিবেশী কোনও দেশের কাছে জলবায়ু সংক্রান্ত কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করেনি।
ভারতের কাছে ক্ষতিপুরণ চায়নি নেপাল
শিশির খানাল বলেন, "আমি বা বিদেশ মন্ত্রকের অন্য কেউ, এমনকি নেপাল সরকারের কেউই ভারত বা অন্য কোনো দেশের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইনি। এর মধ্যে চিন বা আমেরিকাও রয়েছে। আমাদের আবেদন ছিল, বিশ্ববাসী যেন এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে এবং নেপালের উপর এর প্রভাব বোঝে।" হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর পরিবেশগত মিলের কথা তুলে ধরে বিদেশমন্ত্রী কূটনৈতিক বিতর্কের বদলে একসঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়ার উপর জোর দেন।
তিনি বলেন, "আমি এটাও বলেছি যে চিন, ভারত এবং নেপাল—তিনটি দেশই একই রকম পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। হিমালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের সবার উপর পড়ছে। আমাদের আবেদন, এই তিনটি দেশ যেন আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে একজোট হয়। পাশাপাশি, বিশ্ব সম্প্রদায়েরও উচিত নেপালের মতো ছোট দেশগুলোকে সাহায্য করা। এই বিপর্যয়কে শুধু একবারের ঘটনা বা এককালীন সাহায্য হিসেবে না দেখে, বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ভাবা উচিত।"
দিল্লিকে কৃতজ্ঞতা নেপালের
দিল্লির তাৎক্ষণিক ত্রাণ সাহায্যের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খানাল হিমালয়ের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান জানান। খানাল আরও বলেন, "আমরা আমাদের সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎকে একসঙ্গে বাঁচাতে সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত।" বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে যখন ব্যাপক উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ চলছে, তখনই বিদেশমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যা সামনে এল। সংকটের সময়ে যে দেশগুলো নেপালকে মানবিক সাহায্য পাঠিয়েছে, তাদের মধ্যে ভারত অন্যতম। ভারত জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম, মডিউলার ব্রিজ, ডিওয়াটারিং পাম্প এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে।
নেপালে বন্যা দুর্গতদের জন্য সাহায্য
নেপালের আর কী কী সাহায্য প্রয়োজন, সে বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে খানাল বলেন, দুর্যোগের পর থেকেই ভারতীয় কর্মকর্তারা কাঠমান্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, "এই বিপর্যয়ের ঠিক পরেই আমরা ভারতীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বার্তা পেতে শুরু করি। তারা সব ধরনের সাহায্য করেছে এবং জানিয়েছে যে নেপাল সরকারের যখন যা প্রয়োজন হবে, তা দিতে তারা প্রস্তুত।" দিল্লি বেশ কয়েকবার বিমানে করে কয়েক টন ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ওষুধ, জেনারেটর, সোলার ল্যাম্প, তাঁবু এবং জল পরিশোধনের সরঞ্জাম।
২৬ অগাস্ট ভারতের প্রথম বিমানে ১০ টন ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছায়, যার মধ্যে ছিল অস্থায়ী আশ্রয়, কম্বল, হাইজিন কিট, সোলার ল্যাম্প এবং ওষুধ। ২৭ অগাস্ট দ্বিতীয় বিমানে ৩৭.৫ টন ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হয়, যাতে ছিল তাঁবু, কম্বল, হাইজিন কিট, সোলার ল্যাম্প, ডিওয়াটারিং পাম্প, রান্নার সরঞ্জাম, জেনারেটর, ওষুধ এবং খাবার। এরপর আরেকটি বিমানে আরও ১০ টন জিনিস পাঠানো হয়। পরে ভারত পঞ্চম বিমানে ১১ সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল পাঠায়, যাদের সঙ্গে ছিল বিশেষ সরঞ্জাম এবং ৫.৫ টন জরুরি ওষুধ।
খানাল জানান, ভারত তাৎক্ষণিক ত্রাণ, উদ্ধার সামগ্রী এবং ফরেনসিক সহায়তা দিয়েছে। নতুন কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে দুই দেশের মধ্যে কথা হচ্ছে। তিনি বলেন, "প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছে এবং ভারত সরকার আমাদের উদ্যোগে পুরোপুরি সমর্থন জানিয়েছে। ভবিষ্যতেও নতুন কোনো প্রয়োজন হলে আমরা জানাব এবং তারা সাহায্য করতে প্রস্তুত।" বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA)-র তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়া বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,২৫৯ হয়েছে।


