
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শেষ। তিনি আরও দাবি করেন যে তেহরান কর্তৃপক্ষ 'কখনও পরমাণু অস্ত্র না বানানোর' ব্যাপারে রাজি হয়েছে। বৃহস্পতিবার জর্জিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর বার্ট জোন্সের জন্য একটি ভার্চুয়াল র্যালিতে ভাষণ দেওয়ার সময় ট্রাম্প এই কথাগুলো বলেন।
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেন, "আমরা আজ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করেছি, এবং তারা কখনও পরমাণু অস্ত্র না বানানোর ব্যাপারে রাজি হয়েছে। এটাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। ৯৫ শতাংশই ছিল এই বিষয়টি, এবং তারা সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়ে এটা করেছে।"কিন্তু ইরানের সরকারি স্তর থেকে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ওয়াশিংটনের এই দাবির সঙ্গে তেহরানের অবস্থানের বড়সড় ফারাক দেখা যাচ্ছে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, ওয়াশিংটন এবং তেহরান "একটি শান্তি চুক্তি সই করার একেবারে দোরগোড়ায়" রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাতিলের কথাও ঘোষণা করেন, যার হুঁশিয়ারি তিনি আগেই দিয়েছিলেন।
এই কূটনৈতিক সাফল্যের বিশদ বিবরণ দিয়ে ট্রাম্প জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই সপ্তাহান্তেই ইউরোপে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। সিএনএন-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, "আমরা সই করার সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালী আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে। এটা খুব তাড়াতাড়ি হতে পারে, হয়তো এই সপ্তাহান্তেই ইউরোপে। আমি সেখানে থাকতে পারব না, কিন্তু জেডি থাকবে।"
অন্যদিকে, ইরান তাদের অবস্থানে অনড়। ট্রাম্পের এই "বড়সড় নিষ্পত্তির" ঘোষণার পরেও তারা জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনও বোঝাপড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাঈ ট্রাম্পের ইউরোপে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনার জবাবে সরাসরি বলেন, "এখনও পর্যন্ত ইরান চুক্তি নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।"
তেহরানের এই সংশয় আরও স্পষ্ট করে তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে, গত দুই মাসে ট্রাম্প ৩৮ বার দাবি করেছেন যে চুক্তি "আসন্ন"। সংবাদ সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, "যতক্ষণ না ইরান সম্ভাব্য বোঝাপড়ার বিষয়টি ঘোষণা করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বিষয়ে ট্রাম্পের কাছ থেকে আসা যেকোনো খবরকে তাঁর আগের বার্তাগুলোর মতোই গণ্য করা উচিত।" এই টানাপোড়েনের মধ্যেও ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ সামরিক হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়ে আশাবাদী মনোভাব দেখিয়েছেন।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, "ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের স্তরে পৌঁছেছে এবং অনুমোদিত হয়েছে, এই তথ্যের ভিত্তিতে আমি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে, আজ সন্ধ্যায় ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত হামলা ও বোমাবর্ষণ বাতিল করেছি।" তিনি আরও দাবি করেন যে এই কূটনৈতিক আলোচনায় ইজরায়েল-সহ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও অনুমোদন দিয়েছে। যদিও ইজরায়েল ইরানের সঙ্গে যেকোনো কূটনৈতিক চুক্তি নিয়ে বরাবরই সংশয় প্রকাশ করে এসেছে। ট্রাম্পের মতে, এই আলোচনায় অংশ নেওয়া অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো উপসাগরীয় দেশ এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তি। তবে চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত চাপ বজায় থাকবে বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি যোগ করেন, "এই লেনদেন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর থাকবে। সই করার সময় ও স্থান শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে।"
এই টানটান কূটনৈতিক পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন তেহরান ও ওয়াশিংটন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাত শেষ করার জন্য প্রস্তাব বিনিময় করছে। এই সংঘাত পরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চালু থাকলেও, গত কয়েকদিনে দুই দেশই ক্রমবর্ধমানভাবে গোলাগুলিতে জড়িয়েছে।
এই পর্দার আড়ালের কূটনীতি নিয়ে 'অ্যাক্সিওস'-এর একটি প্রতিবেদনে ভেতরের খবর সামনে আনা হয়েছে। জানা গেছে, বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত তেহরানে আলোচনা চলে। সেখানে কাতারের দূত আলি আল-থাওয়াদি এবং ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে বাকি সমস্যাগুলো মেটানোর চেষ্টা করেন।
ঘটনা সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র ওই মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, কাতারি এবং ইরানি প্রতিনিধিরা একটি চুক্তির খসড়ায় একমত হয়েছেন, যা আমেরিকাও মেনে নেবে বলে তারা মনে করছেন।
সূত্র অনুযায়ী, তিনটি মূল বিষয়ে মতপার্থক্য কমানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের আটকে থাকা অর্থ ছাড়ার প্রক্রিয়া, "৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়" হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার ব্যবস্থা এবং ওই একই সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কাঠামো।
যদিও এই প্রযুক্তিগত বিষয়গুলিতে সমঝোতা হয়েছে, চূড়ান্ত সমাধান এখনও তেহরানের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অনুমোদনের উপর নির্ভর করছে। ইরানি কর্মকর্তারা আলোচকদের জানিয়েছেন যে আলোচনা নীতিগতভাবে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে, কিন্তু খামেনি এখনও তাঁর চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি।