
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বড়সড় কূটনৈতিক চাল দিলেন। তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে ৮ জন মহিলাকে মুক্তি দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন, যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার মুখে বলে খবর। দুই চিরশত্রু দেশের মধ্যে আসন্ন আলোচনার আগে এই পদক্ষেপকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট ইয়াল ইয়াকোবির একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করেন, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে ইরানে ৮ জন মহিলাকে ফাঁসি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইয়াকোবির পোস্টে ওই মহিলাদের ছবিও দেওয়া হয়েছিল।
ইরান সরকারের উদ্দেশে ট্রাম্প লেখেন, "ইরানের নেতাদের বলছি, যারা শীঘ্রই আমার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চলেছেন: আপনারা যদি এই মহিলাদের মুক্তি দেন, আমি খুব খুশি হব। আমি নিশ্চিত যে আপনারা এই পদক্ষেপ নিলে তারা বিষয়টিকে সম্মান জানাবে। দয়া করে ওদের কোনও ক্ষতি করবেন না! আমাদের আলোচনার জন্য এটা একটা দারুণ শুরু হতে পারে!!! এই বিষয়ে নজর দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।"
ট্রাম্প এই আবেদন এমন সময় করেছেন, যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরানি ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বুধবার শেষ হতে চলেছে, যার ফলে কূটনৈতিক পরিস্থিতি বেশ টালমাটাল। গোটা বিশ্বের নজর এখন পাকিস্তানের রাজধানীর দিকে থাকলেও, ইরানি প্রতিনিধিদেক পাকিস্তানে উপস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর আসছে:
Axios-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি একটি প্রতিনিধি দলকে ইসলামাবাদ যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। একে উত্তেজনা কমানোর একটি সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম IRIB জানিয়েছে, তাদের কোনও প্রাথমিক বা দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধি দল এখনও পাকিস্তানে যায়নি। এই বয়ান থেকে ইরানের অন্দরের মতবিরোধ স্পষ্ট। এক বিবৃতিতে IRIB সাফ জানিয়েছে, "ইরানের কোনও কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল - তা সে প্রাথমিক হোক বা দ্বিতীয় পর্যায়ের - এখনও পর্যন্ত পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যায়নি।"
তেহরানের এই প্রকাশ্য অবস্থান সত্ত্বেও, ইসলামাবাদের সূত্র মারফৎ খবর, মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধি দল একই সময়ে ইসলামাবাদে পৌঁছতে পারে। পাকিস্তান সরকার এই বৈঠকের জন্য উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ও অন্যান্য ব্যবস্থা চূড়ান্ত করছে।
আল আরাবিয়ার একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, এক উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল মঙ্গলবার একই সঙ্গে পাকিস্তানের রাজধানীতে পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঘটনাকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি বড় অগ্রগতির সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে এই উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিতে দুই পক্ষই ইসলামাবাদে আসছে।
এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য একটি "১০-দফা পরিকল্পনা" নিয়ে কথা বলা, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং চলমান ২০২৬-এর সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা অন্তর্ভুক্ত।
তবে, কথার লড়াই এখনও থামেনি। ট্রাম্প সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, চুক্তি ছাড়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে "প্রচুর বোমা ফেলা হবে"। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরান "ভয়ের ছায়ায়" কোনও আলোচনায় বসবে না।
গোটা বিশ্ব এখন ইসলামাবাদে এই মুখোমুখি বৈঠকের খবরের জন্য অপেক্ষা করছে। তেহরান যদি ওই আট মহিলাকে মুক্তি দেয়, তবে এটি এমন একটি সংঘাতের মধ্যে প্রথম মানবিক সাফল্য হবে, যা দুই দেশকে প্রায় পুরোদস্তুর যুদ্ধের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে।