
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ আজ ১৯ দিনে পড়ল। দুই পক্ষ এখনও যুদ্ধে ইতিটানার ব্যাপারে তেমন কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। আর সেই কারণে যুদ্ধ অনন্তকাল ধরে চলবে- তেমনই আশঙ্কা। কিন্তু সেই জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার সাফ জানিয়ে দিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকা তাদের পরিকল্পনা মতোই এগোচ্ছে। তবে এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে চাননি তিনি। পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি আরও বলেন, "আমরা যেমনটা বলেছি, আমরা পরিকল্পনা অনুসারেই চলছি।"
সংবাদমাধ্যমের একাংশকে নিশানা করে তিনি বলেন, "এখানকার মিডিয়া, সবাই নয়, তবে অনেকেই এমনটা বোঝাতে চাইছে যে, এই সংঘাত শুরু হওয়ার মাত্র ১৯ দিনের মধ্যেই আমরা যেন এক অনন্ত যুদ্ধ বা চোরাবালিতে ফেঁসে গিয়েছি। কিন্তু সত্যিটা এর থেকে অনেক দূরে।"
হেগসেথ বলেন, "আমার কথাটা শুনুন। আমি সেই লক্ষ লক্ষ সেনার মধ্যে একজন, যারা ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছে। আমি দেখেছি বুশ, ওবামা এবং বাইডেনের মতো বোকা রাজনীতিবিদরা কীভাবে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। কিন্তু এই যুদ্ধটা সেরকম নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক ভালো বোঝেন। 'অপারেশন এপিক ফিউরি' সম্পূর্ণ আলাদা। এর লক্ষ্য একেবারে নির্দিষ্ট এবং এটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক।"
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকে তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য একই রয়েছে। "আমাদের 'আমেরিকা ফার্স্ট' প্রেসিডেন্টের দেওয়া উদ্দেশ্যগুলো প্রথম দিনের মতোই আছে। এগুলো মিডিয়ার ঠিক করে দেওয়া উদ্দেশ্য নয়, ইরানেরও নয়, বা কোনও নতুন উদ্দেশ্যও নয়। আমাদের উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত, লক্ষ্যে স্থির এবং পরিকল্পনা মাফিক চলছে। উদ্দেশ্যগুলো হলো— ইরানের মিসাইল, লঞ্চার এবং প্রতিরক্ষা শিল্প ঘাঁটি ধ্বংস করা যাতে তারা পুনরায় তা গড়তে না পারে, তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র হাতে না পায়, তা নিশ্চিত করা। প্রথম দিন থেকেই আমাদের এই উদ্দেশ্য," বলেন তিনি।
সবশেষে সংবাদমাধ্যমের 'দেশপ্রেমিক' সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "যুদ্ধের সময় কেউই নিখুঁত হতে পারে না। এই ভবন (পেন্টাগন) সেটা সবচেয়ে ভালো জানে। কিন্তু বাস্তবটা তুলে ধরুন। আমরা নির্ণায়কভাবে এবং আমাদের শর্তেই জিতছি।"
"এখন পর্যন্ত, আমরা ইরান এবং এর সামরিক অবকাঠামো জুড়ে ৭,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছি। এটি কোনো সামান্য বা পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি হলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রয়োগকৃত এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। এবং আবারও বলছি, ঠিক গতকালের মতোই—আজকের হামলাটিও হবে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও ব্যাপক হামলা। যেমনটা আমি প্রথম দিন থেকেই বলে আসছি, আমাদের সামরিক সক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে; অন্যদিকে ইরানের সক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। আমরা শত্রুদের খুঁজে বের করছি এবং আঘাত হানছি—আকাশপথ থেকে বয়ে আনছি মৃত্যু ও ধ্বংস," যুদ্ধসচিব (Secretary of War) এমনটাই মন্তব্য করেছেন।
হেগসেথ ইরানের সামরিক ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অবনতির বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন; যার মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন লাইন এবং সরাসরি হামলার শিকার হওয়া শত শত প্রতিরক্ষা শিল্প-কেন্দ্র।
তিনি আরও জানান যে, নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাই সবচেয়ে বড় আঘাতের সম্মুখীন হয়েছে; যার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়—সংঘাত শুরুর পর থেকে মার্কিন বাহিনীর ওপর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হার ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
"ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প-কাঠামো—অর্থাৎ সেই সব কারখানা ও উৎপাদন লাইন, যা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচিকে সচল রাখে—তা এখন ব্যাপকভাবে ধ্বংসের মুখে। আমরা তাদের শত শত প্রতিরক্ষা শিল্প-কেন্দ্রে সরাসরি আঘাত হেনেছি। সম্ভবত, নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতাই সবচেয়ে বড় আঘাতের শিকার হয়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে আমাদের বাহিনীর ওপর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হার ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে," তিনি যোগ করেন।
যুদ্ধসচিব ইরানের নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও উল্লেখ করেন এবং বলেন, "আমরা তাদের নৌবাহিনীর ১২০টিরও বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছি কিংবা ডুবিয়ে দিয়েছি; এছাড়া আরও অনেক জাহাজের ক্ষেত্রে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ এখনো চলছে। তাদের সাবমেরিনগুলো—যার সংখ্যা একসময় ১১টি ছিল—এখন আর অবশিষ্ট নেই। তাদের সামরিক বন্দরগুলো এখন সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে।"