
নিউ ইয়র্ক: ইরানের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানে কোন কোন অস্ত্র ও বিমান ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। 'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামের এই সামরিক পদক্ষেপে ১০০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই অপারেশনে ২৩টিরও বেশি ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরানের ওপর মারাত্মক ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র দিয়ে আঘাত হানা হয়। ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটাই আমেরিকার সবচেয়ে বড় বিমান বাহিনী মোতায়েন।
এই হামলা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, তেহরানের স্থানীয় সময় সকাল ৯:৪৫-এ, অর্থাৎ দিনের আলোতেই। ইজরায়েলের 'অপারেশন রোরিং লায়ন' নামে একটি সামরিক অভিযানের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় রেখেই 'এপিক ফিউরি' চালানো হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ইরানের পরমাণু অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্প নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েই আমেরিকা ও ইজরায়েল এই হামলা চালায়।
মার্কিন-ইজরায়েলি যৌথ বাহিনী ইরানের সামরিক পরিকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষতি করলেও, ইরানও পাল্টা জবাব দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি এবং অসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইরান। আমেরিকা নিশ্চিত করেছে যে, এই হামলায় তাদের তিনজন সেনা সদস্য নিহত এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ইরানের হামলায় বারোজন সাধারণ নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন।
১৯৯১ সালের 'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম'-এর আদলে সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্রগুলিতে আক্রমণ চালায়। এর মধ্যে ছিল আয়াতুল্লাহর দপ্তর, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সদর দপ্তর, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, ব্যালিস্টিক মিসাইল কেন্দ্র, নৌবাহিনীর জাহাজ, সাবমেরিন এবং সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্র।
বি-২ স্পিরিট (B-2 Spirit):
আমেরিকা থেকে সরাসরি উড়ে এসে বি-২ বোমারু বিমানগুলি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কেন্দ্রগুলিতে হামলা চালায়। এর জন্য ২০০০ পাউন্ড (প্রায় ৯০৭ কেজি) ওজনের গাইডেড বোমা ব্যবহার করা হয়। এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল তথ্যানুযায়ী, প্রথম মিশনে চারটি বি-২ বিমান অংশ নিয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
এফ-৩৫ লাইটনিং টু (F-35 Lightning II):
আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৩০টি এফ-৩৫ স্টেলথ বিমান মোতায়েন করেছে। এছাড়া, ইরানের দক্ষিণে সমুদ্রে থাকা মার্কিন বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে এফ-৩৫সি বিমানের একটি স্কোয়াড্রনও এই হামলায় অংশ নেয়।
এফ-২২ র্যাপ্টর (F-22 Raptor):
এই প্রথমবার এই ধরনের কোনও যুদ্ধের জন্য ইজরায়েলে এফ-২২ বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এর প্রধান কাজ হল অন্য বিমানগুলিকে সুরক্ষা দেওয়া এবং শত্রু বিমানকে প্রতিহত করা।
এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন (F-16 Fighting Falcon):
শত্রুপক্ষের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ধ্বংস করার ক্ষমতাসম্পন্ন কয়েক ডজন এফ-১৬ বিমান মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে, যদিও আমেরিকা এর সঠিক সংখ্যা জানায়নি।
এ-১০ থান্ডারবোল্ট টু (A-10 Thunderbolt II):
এই বিমান স্থলবাহিনীকে সাহায্য করতে এবং শত্রুর ঘাঁটি ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়। এই অঞ্চলে এ-১০ থান্ডারবোল্টের অন্তত একটি স্কোয়াড্রন রয়েছে।
ইএ-১৮ গ্রাউলার (EA-18 Growler):
এই বিমানগুলি শত্রুর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে জ্যাম বা বিকল করে দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন—এই দুটি বিমানবাহী জাহাজ থেকে এগুলি পরিচালনা করা হয়।
লুকাস ড্রোন (LUCAS Drones):
এগুলি হল 'ওয়ান ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন'। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকায় এই প্রথম ইরানে এই ড্রোন ব্যবহার করল। এটি একটি কম খরচের চালকবিহীন যুদ্ধাস্ত্র ব্যবস্থা।
এম-১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট:
এটি এমন একটি সিস্টেম যা একসঙ্গে একাধিক মিসাইল ছুড়তে পারে। ১৯৯৬ সালে লকহিড মার্টিন মিসাইলস এটি তৈরি করে। এর মাধ্যমে প্রায় ছয়টি মিসাইল ছোড়া সম্ভব।
সেন্ট্রাল কমান্ড আরও জানিয়েছে, এগুলি ছাড়াও লুকাস ড্রোন, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল সিস্টেম, থাড ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্র্যাফট, এয়ারবোর্ন কমিউনিকেশন রিলে, পি-৮ মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্র্যাফট, আরসি-১৩৫, এমকিউ-৯ রিপার্স, এম-১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম, পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী জাহাজ, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার বিমান, রিফুয়েলিং জাহাজ, সি-১৭ গ্লোবমাস্টার কার্গো বিমান এবং সি-১৩০ কার্গো বিমানও ব্যবহার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, সেন্ট্রাল কমান্ড যোগ করেছে যে তাদের কিছু বিশেষ নিজস্ব ব্যবস্থাও এই আক্রমণে ব্যবহার করা হয়েছে।