আমেরিকার মধ্যস্থতায় তেহরানের সঙ্গে চুক্তি হলেও ইজরায়েল নিজেদের অবস্থানে অনড়। তারা জানিয়েছে, হেজবোল্লার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলবে এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক চুক্তিকে উপেক্ষা করে ইরানে একতরফা হামলা চালাতেও তারা প্রস্তুত।
একতরফা সামরিক অভিযান চালাবে ইজরায়েল, হুঁশিয়ারি ইরানকে
আমেরিকার মধ্যস্থতায় তেহরানের সঙ্গে নতুন চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েল নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিল। জেরুজালেম সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন অ্যাফেয়ার্স (JCFA)-এর সিইও সাগিভ স্টাইনবার্গ সাফ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক চুক্তি যাই হোক না কেন, হেজবোল্লার বিরুদ্ধে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান চলবে। এমনকি, প্রয়োজন হলে ইরানে একতরফা হামলা চালাতেও তারা পিছপা হবে না।

এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্টাইনবার্গ জোর দিয়ে বলেন, ইজরায়েলের উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। ৭ অক্টোবরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ইজরায়েল আর নিজের দোরগোড়ায় কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীকে সহ্য করবে না। তিনি বলেন, "গত সপ্তাহে কী হয়েছে, গতকাল কী হয়েছে, আমরা সব দেখেছি। আমেরিকা এই হামলার সঙ্গে একমত ছিল না, কিন্তু এই চুক্তি তারই ফল। আমাদের এটা ভুললে চলবে না। হেজবোল্লাকে আবার শক্তি সঞ্চয় করার জন্য বসে থাকার বিলাসিতা ইজরায়েলের নেই। ৭ অক্টোবর যা হয়েছিল, আমরা দেখেছি। ইজরায়েল সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে পারে না। ইজরায়েলের সীমান্তে এমন কোনো সন্ত্রাসবাদী সংগঠন থাকতে পারে না, যারা একদিন সকালে হামলা চালিয়ে মানুষ খুন করবে আর অপহরণ করবে। এমন পরিস্থিতি আর হতে দেওয়া যায় না। ইজরায়েল এটা মেনে নিতে পারে না।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের লক্ষ্য হল ইজরায়েলের উত্তরে শান্তি ফেরানো এবং হেজবোল্লার বিপদ দূর করা। আর সেই জন্য ইজরায়েল আজ যা করছে, তা চালিয়ে যেতে হবে। আমি বলছি না যে প্রতিদিন দাহিয়েহে (বৈরুত) হামলা চালাতে হবে, কিন্তু বিপদ থাকলে ইজরায়েলকে হামলা চালাতেই হবে। আমেরিকা রাজি না হলেও," বলেন তিনি।
যুদ্ধবিরতির শর্ত হেজবোল্লার অবসান
স্টাইনবার্গ স্পষ্ট করে দেন, ইজরায়েল তখনই সামরিক অভিযান থামানোর কথা ভাববে, যখন লেবাননের সরকার হেজবোল্লাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করার দায়িত্ব পালন করবে। তার মতে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতির এটাই একমাত্র পথ। তিনি বলেন, "আমার মনে হয়, লেবানন সরকারের সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার আগে পর্যন্ত ইজরায়েল লেবাননে সেনা অভিযান স্থগিত রাখবে। চুক্তি অনুযায়ী, তাদের হেজবোল্লাকে নিরস্ত্র করার কথা। যখন লেবাননের সেনা সেই কাজ করবে, তখনই আমরা হেজবোল্লার বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতির কথা বলতে পারি।"
আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্ক এবং 'কৌশলগত মতভেদ'
আমেরিকা-ইরান চুক্তি থেকে ইজরায়েলকে বাদ রাখা হয়েছে বলে যে দাবি উঠছে, সেই প্রসঙ্গে JCFA-এর সিইও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে "ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু" বলে উল্লেখ করেন। তিনি ইজরায়েল ও আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্পের গভীর সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দেন। তবে তিনি এটাও বলেন যে, সত্যিকারের "বন্ধুত্বে" কৌশলগত মতপার্থক্য থাকতেই পারে, বিশেষ করে আমেরিকা-ইরান চুক্তির ক্ষেত্রে। তিনি যোগ করেন, এই চুক্তি "ইজরায়েলের জন্য প্রযোজ্য নয়।"
তিনি বলেন, "ট্রাম্প ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু। এটা আমাদের ভুললে চলবে না। তিনি ইজরায়েলের সঙ্গে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তিনি এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্প ইজরায়েলকে আমেরিকার সর্বকালের সেরা সহযোগী হিসেবে দেখে। কিন্তু বন্ধুদের মধ্যেও এমন কিছু বিষয় থাকে যা সমাধান করা যায়, আলোচনা করা যায়। আমার মনে হয় না ইজরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে এটাই শেষ কথা। চুক্তিটা হয়েছে আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে। ইজরায়েলের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের কথা শুনে আমার যা মনে হচ্ছে, এই চুক্তি ইজরায়েলের জন্য প্রযোজ্য নয়।"
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সতর্কবার্তা
স্টাইনবার্গ আরও স্পষ্ট করে দেন যে, তেহরান যদি এই চুক্তির সুযোগ নিয়ে "তার পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় চালু করার" চেষ্টা করে, তাহলে জেরুজালেম এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে একাই পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, "কিন্তু আমার মনে হয়, ইজরায়েল যদি আবার দেখে যে ইরান ব্যালিস্টিক মিসাইল শিল্প বা তার পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় তৈরি করছে, তাহলে সমস্যা হবে। এবং ইজরায়েলের উচিত হবে, এবং ইজরায়েল করবেও, আমেরিকাকে ছাড়াই ইরানে আবার হামলা চালানো।"
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কড়া অবস্থান, সেনা প্রত্যাহার নয়
স্টাইনবার্গের এই মন্তব্যের পরেই ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ ঘোষণা করেছেন যে, ইজরায়েলি সেনা সীমান্ত থেকে এক পা-ও পিছু হটবে না। আমেরিকার নেতৃত্বে হওয়া এই নতুন কূটনৈতিক চুক্তিকে কার্যত অগ্রাহ্য করেছেন তিনি। ইজরায়েলি মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, জেরুজালেম সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা সেনা প্রত্যাহারের কোনো আন্তর্জাতিক সময়সীমা মানবে না।
ইজরায়েলি মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ দেশের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বাইরের কোনো কূটনৈতিক চাপ দেশের বর্তমান প্রতিরক্ষা বিন্যাস বদলাতে পারবে না। তিনি বলেন, "ইজরায়েলের নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য আইডিএফ (ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস) লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে।"
কাটজ এই কড়া অবস্থান আরও জোরদার করে বলেন যে, জেরুজালেম ইতিমধ্যেই তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর (আমেরিকা) সঙ্গে এই নতুন চুক্তির শর্ত নিয়ে কথা বলেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, "আমরা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের তীব্র বিরোধী, এই অবস্থান আমেরিকাকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।"
তিনি উত্তর সীমান্তে যেকোনো ধরনের উত্তেজনার জন্য তেহরানকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "যদি ইরান লেবাননের উপর দিয়ে হামলা চালায়, ইজরায়েল পূর্ণ শক্তি দিয়ে প্রত্যাঘাত করবে।" ইজরায়েলি মিডিয়া অনুযায়ী, কাটজ জোর দিয়ে বলেছেন যে "বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতের সমস্ত চাপ সত্ত্বেও ইজরায়েল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার প্রত্যাখ্যান করছে," এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন "নেতানিয়াহু এই কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।"
লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার এই স্পষ্ট অভিপ্রায় ইরানের প্রত্যাশার বিপরীত। তবে, এখনও পর্যন্ত আমেরিকা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে লেবাননে একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছে।


