
আমরা অনেক সময় বলি, "ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে শরীর খারাপ।" কথাটা কি এমনি এমনি বলা? না, এর পেছনে বিজ্ঞান আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আজকাল ফেস রিডিং, ফেস ম্যাপিং নিয়ে হাজার হাজার ভিডিও। কেউ বলছে কপালে ব্রণ মানেই লিভার খারাপ, কেউ বলছে নাক লাল মানেই হার্টের রোগ। এইসব ভিডিও দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। আসল সত্যটা জানা জরুরি। আয়ুর্বেদে বহু বছর আগে থেকেই মুখ দেখে রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি ছিল, যাকে বলে মুখ পরীক্ষা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলে ফেসিয়াল ডায়াগনোসিস। কিন্তু ডাক্তাররা বলছেন, মুখের জন্মগত গঠন দিয়ে সরাসরি রোগ বলা যায় না। আপনার মুখ লম্বা বলে আপনার কিডনি খারাপ, বা গোল মুখ বলে হার্টের রোগ হবে— এমনটা একদম ভুল এবং কুসংস্কার। মুখের জন্মগত গঠন নির্ভর করে জিন, হাড়ের গঠন আর বংশগত কারণে।
তাহলে সত্যিটা কী? সত্যি হলো, মুখের গঠন নয়, মুখের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে শরীরের ভেতরের অসুখের অ্যালার্ম পাওয়া যায়। আপনার শরীরের ভেতরে কোনও অঙ্গ ঠিকমতো কাজ না করলে তার প্রথম সংকেত ফুটে ওঠে মুখে। কারণ মুখে রক্ত সঞ্চালন সবচেয়ে বেশি এবং ত্বক সবচেয়ে পাতলা।
হঠাৎ করে যদি দেখেন আপনার মুখ গোল, ফোলা ফোলা হয়ে যাচ্ছে, গাল ভরে যাচ্ছে, ঘাড়ের পেছনে চর্বি জমছে, তাহলে সাবধান। এটি কুশিং সিনড্রোমের লক্ষণ হতে পারে। শরীরে কর্টিসল হরমোন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে এমন হয়। অনেক সময় দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেলেও মুখ এমন ফুলে যায়।
বড় বয়সে এসে যদি মনে হয় আপনার নিচের চোয়াল, হাত-পা, নাক অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাচ্ছে, জুতোর সাইজ বাড়ছে, আংটি আঁট হচ্ছে, তবে এটি অ্যাক্রোমেগালি নামে হরমোনের রোগ হতে পারে। শরীরে গ্রোথ হরমোন বেশি তৈরি হলে এই রোগ হয়।
রাত জাগলে কালি পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন চোখের নিচে জল জমে ফুলে আছে, তাহলে অবহেলা করবেন না। এটি কিডনির দুর্বলতার বড় লক্ষণ। কিডনি ঠিকমতো শরীর থেকে জল ও লবণ বের করতে না পারলে মুখে, বিশেষ করে চোখের নিচে জল জমে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখুন। চোখের সাদা অংশ, জিভ, ত্বক কি হলুদ লাগছে? মুখ কি ফ্যাকাশে-হলুদ? এটি লিভারের বড় সংকেত। লিভারে বিলিরুবিন জমলে জন্ডিস হয়, যা প্রথমে চোখে-মুখে ধরা পড়ে। এর সঙ্গে প্রস্রাব হলুদ, দুর্বলতা থাকলে দ্রুত LFT টেস্ট করান।
এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক লক্ষণ। হঠাৎ করে যদি মুখের একপাশ বেঁকে যায়, হাসতে গেলে একদিক বেঁকে থাকে, কথা জড়িয়ে যায়, চোখ বন্ধ করতে অসুবিধা হয়, তবে এটি স্ট্রোক বা বেলস পালসির লক্ষণ হতে পারে। এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে যান। এটি গোল্ডেন আওয়ারের ব্যাপার।
মহিলাদের গালে, থুতনিতে, গোঁফের জায়গায় হঠাৎ শক্ত, মোটা লোম গজানো, সঙ্গে অনিয়মিত পিরিয়ড, ওজন বাড়া ও কিছুতেই ব্রণ না কমা - এটি PCOS বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের প্রধান লক্ষণ। শরীরে পুরুষ হরমোন বেড়ে গেলে এমন হয়।
মনে রাখবেন, মুখ দেখে ১০০% রোগ নির্ণয় সম্ভব নয়। এটি শুধু প্রাথমিক সতর্কবার্তা বা স্ক্রিনিং। ফেস রিডিং ভিডিও দেখে নিজে নিজে রোগ ধরে নিয়ে ওষুধ খাবেন না। তাই সৌন্দর্য ফিল্টারে মুখ ঢাকার আগে, শরীরের কথা শুনুন। প্রতিদিন আয়নায় নিজের মুখটা ১ মিনিট খেয়াল করুন। যদি দেখেন— গত ২-৩ মাসে মুখের গঠন, রঙ, ফোলা ভাব অস্বাভাবিকভাবে বদলেছে, সঙ্গে ওজন বাড়া-কমা, ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা আছে, তাহলে সেটা গোপন অসুখের ইশারা হতে পারে। সন্দেহ হলে ফেসবুকের ফেস রিডারের কাছে নয়, যান একজন মেডিসিনের ডাক্তারের কাছে।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News