
রূপচর্চার দুনিয়ায় প্রতিদিন নতুন নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে। গ্লাস স্কিন, কর্টিসল ফেসের পর এবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে *‘ফেরিটিন ফেস’*। টিকটক, ইনস্টাগ্রামে হাজার হাজার মেয়ে নিজেদের বিফোর-আফটার ছবি শেয়ার করে বলছেন, আয়রন সাপ্লিমেন্ট খেয়ে তাদের ফেরিটিন ফেস একেবারে গায়েব হয়ে গেছে। কিন্তু আদৌ কি মুখ দেখে বোঝা যায় শরীরে আয়রন কম কিনা? চলুন বিস্তারিত জানি।
চিকিৎসকরা স্পষ্ট বলছেন, *‘ফেরিটিন ফেস’ কোনও মেডিক্যাল টার্ম বা রোগের নাম নয়। এটি সম্পূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়ার তৈরি একটি শব্দবন্ধ।*
ফেরিটিন হল একটি প্রোটিন যা আমাদের শরীরে আয়রনকে সঞ্চয় করে রাখে। যখন শরীরে আয়রনের ঘাটতি হয়, তখন রক্তে ফেরিটিনের মাত্রা কমে যায়। আয়রন আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা সারা শরীরে অক্সিজেন বহন করে। অক্সিজেন ঠিকমতো না পৌঁছালে ত্বক, চুল, নখে তার প্রভাব পড়ে। এই ধারণা থেকেই এসেছে ফেরিটিন ফেস কথাটি।
*ফেরিটিন ফেস হলে মুখে কী কী হয়? ভাইরাল লক্ষণগুলো কী?*
সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের মতে, ফেরিটিন কম থাকলে মুখে এই পরিবর্তনগুলো আসে:
*১. ফ্যাকাশে ও নিষ্প্রাণ ত্বক:* মুখে কোনও গ্লো থাকে না, ধূসর বা হলদেটে ফ্যাকাশে লাগে। লিপস্টিক ছাড়া ঠোঁট একেবারে সাদা দেখায়।
*২. চোখের নিচে গাঢ় কালি:* ৮ ঘণ্টা ঘুমিয়েও চোখের নিচে কালি যায় না। চোখ ঢুকে যায়, ক্লান্ত লাগে।
*৩. সবসময় ক্লান্ত দেখানো:* মনে হয় যেন আপনি অসুস্থ। মুখ দেখে মনে হয় ঘুম হয়নি বহুদিন।
*৪. অতিরিক্ত চুল পড়া ও ভ্রু পাতলা হওয়া:* বিশেষ করে মাথার সামনের দিকে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া।
*৫. ঠোঁটের কোণে ঘা ও নখ ভাঙা:* ঠোঁটের দুপাশে কাটা, জিভে ঘা, নখ সহজেই ভেঙে যাওয়া।
*৬. শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড়:* অল্প হাঁটলেই হাঁপিয়ে যাওয়া।
*বিজ্ঞান কী বলছে? সত্যিই কি মুখ দেখে বোঝা যায়?*
এর পেছনে আংশিক সত্যি আছে। মেডিক্যাল গবেষণা বলছে, যখন গুরুতর আয়রনের ঘাটতি হয় এবং তা থেকে *আয়রন ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া* হয়, তখন লোহিত রক্তকণিকা কমে যায়। ফলে ত্বক ও ঠোঁট ফ্যাকাশে দেখায়। চুল পড়াও আয়রন কমের একটি প্রমাণিত লক্ষণ।
কিন্তু সমস্যা হল, এই লক্ষণগুলো খুবই ‘নন-স্পেসিফিক’। অর্থাৎ শুধু আয়রন কমলেই এমন হয় না। কম ঘুম, অতিরিক্ত স্ট্রেস, জল কম খাওয়া, ভিটামিন D বা B12-এর অভাব, থাইরয়েডের সমস্যা, জেনেটিক কারণেও একই রকম ফ্যাকাশে ভাব ও ডার্ক সার্কেল হতে পারে। তাই শুধু আয়না দেখে নিজেকে ‘ফেরিটিন ফেস’ বলে দাগিয়ে দেওয়া একেবারেই ভুল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেরিটিনের মাত্রা বোঝার একমাত্র উপায় হল *রক্ত পরীক্ষা*। ফেরিটিন টেস্টের সঙ্গে হিমোগ্লোবিন, আয়রন প্রোফাইল দেখা জরুরি।
*কাদের ফেরিটিন কম হওয়ার ঝুঁকি বেশি?*
- যেসব মহিলাদের পিরিয়ডে অতিরিক্ত ব্লিডিং হয়।
- গর্ভবতী মহিলাদের।
- নিরামিষাশী বা ভেগান ডায়েট করেন যারা।
- যাদের IBS বা Inflammatory Bowel Disease আছে।
- যারা অতিরিক্ত ডায়েট করেন।
*ফেরিটিন ফেস থেকে মুক্তি পাবেন কীভাবে? কী করবেন?*
*১. নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট নয়:* টিকটক দেখে আয়রন ট্যাবলেট বা ইনফিউশন নিতে যাবেন না। শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমা হলে লিভারের ক্ষতি হতে পারে।
*২. ডাক্তারের পরামর্শ ও টেস্ট:* যদি টানা ক্লান্তি, বুক ধড়ফড়, অতিরিক্ত চুল পড়া, ফ্যাকাশে ভাব থাকে, তাহলে একজন ফিজিশিয়ানের পরামর্শ নিন। তিনি প্রয়োজন মনে করলে Ferritin Test দেবেন।
*৩. খাদ্যাভ্যাসে বদল আনুন:* প্রতিদিনের খাবারে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার রাখুন - রেড মিট, ডিমের কুসুম, মুসুর ডাল, ছোলা, পালং শাক, বিট, কচু শাক, খেজুর, কালো কিসমিস।
*৪. ভিটামিন C-এর সঙ্গে আয়রন:* আয়রনের সঙ্গে লেবু, কমলালেবু, পাতিলেবু বা টকদই খান। ভিটামিন C আয়রন শোষণ ৬ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। চা-কফি খাওয়ার ঠিক আগে বা পরে আয়রন খাবার খাবেন না, এতে আয়রন শোষণে বাধা দেয়।
*৫. সঠিক স্কিনকেয়ার:* আয়রন ঠিক থাকলেও যদি ডার্ক সার্কেল থাকে, তাহলে ভালো ঘুম, পর্যাপ্ত জল, সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
মনে রাখবেন, সুন্দর ত্বকের জন্য শুধু বাইরে থেকে ক্রিম মাখলেই হবে না, ভিতর থেকে শরীর সুস্থ রাখা জরুরি। তাই ভাইরাল ট্রেন্ডে গা না ভাসিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নিজের যত্ন নিন।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News