
ভারতের জাতীয় স্তোত্র, জন গণ মন, কেবল কয়েকটি পংক্তি নয়; এটি ভারতের বৈচিত্র্য, ঐক্য এবং অখণ্ডতার একটি জীবন্ত প্রতীক। প্রজাতন্ত্র দিবস এবং স্বাধীনতা দিবস সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই সুর শুনলে প্রতিটি ভারতীয়ের মাথা গর্বে ফুলে ওঠে। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসের মাত্র দুই দিন আগে, গণপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে জন গণ মনকে ভারতের জাতীয় স্তোত্র হিসেবে গ্রহণ করে।
জন গণ মন-এর ইতিহাস নিয়ে মাঝে মাঝে বিতর্ক এবং ভুল বোঝাবুঝি দেখা দেয়। প্রশ্ন ওঠে: জাতীয় স্তোত্র হিসেবে গৃহীত এই গানটি কি ব্রিটিশদের সম্মানে রচিত হয়েছিল? কেন এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বজায় থাকে? এটি কীভাবে জাতীয় স্তোত্র হয়ে ওঠে এবং এরসঙ্গে সম্পর্কিত নিয়মগুলি কী কী?
জন গণ মন ১৯১১ সালে বিশ্বখ্যাত কবি এবং নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন। মূলত বাংলা ভাষায় লেখা, এটি সংস্কৃত তৎসম শব্দ দ্বারা প্রাধান্য পেয়েছে। এটি ঠাকুরের "ভারত ভাগ্য বিধাতা" কবিতার প্রথম স্তবক। গানটি প্রথম গাওয়া হয়েছিল ২৭ ডিসেম্বর, ১৯১১ সালে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা (বর্তমানে কলকাতা) অধিবেশনে। মজার বিষয় হল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এর সুর রচনা করেছিলেন। পরে, ১৯১৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের মদনপল্লীতে অবস্থানকালে, তিনি এটিকে ইংরেজিতে "ভারতের সকালের গান" হিসেবে অনুবাদ করেছিলেন। জন গণ মন ১৯১১ সালে কবি ও নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন।
এটি সত্য নয়। তবে, একটি ভুল ধারণা কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান। প্রায়শই যুক্তি দেওয়া হয় যে ঠাকুর ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের ভারতে আগমনের সময় তাকে স্বাগত জানাতে এটি লিখেছিলেন। এই ভুল ধারণার মূল কারণ ছিল সেই সময়ের কিছু মিডিয়া রিপোর্ট। ২৭ ডিসেম্বর, ১৯১১ তারিখে, একই কংগ্রেস অধিবেশনে স্কুলছাত্রীরা পঞ্চম জর্জকে স্বাগত জানাতে আরেকটি গান গেয়েছিল।
পরের দিন, কিছু ব্রিটিশ সংবাদপত্র ভুল করে রিপোর্ট করেছিল যে ঠাকুরের গানটি সম্রাটের প্রশংসায় লেখা ছিল। ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই একটি চিঠিতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে ভারতের ভাগ্য ব্রিটিশ সম্রাট দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না, বরং সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা ভারতের বিবেক দ্বারা নির্ধারিত হয়, যা যুগ যুগ ধরে দেশকে পরিচালিত করে আসছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে গানে ব্যবহৃত "অধিনায়ক" শব্দটি সেই সর্বোচ্চ শক্তিকেও নির্দেশ করে, কোনও বিদেশী শাসককে নয়।
ভারতের স্বাধীনতার পর, জাতীয় স্তোত্র নিয়ে গণপরিষদে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। অবশেষে, ২৪শে জানুয়ারি, ১৯৫০ তারিখে, প্রজাতন্ত্র দিবসের মাত্র দুই দিন আগে, গণপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে "জন গণ মন" কে ভারতের জাতীয় স্তোত্র হিসেবে গ্রহণ করে। এই দিনে, 'বন্দে মাতরম' কে জাতীয় স্তোত্রের মর্যাদাও দেওয়া হয়েছিল। ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ গণপরিষদে ঘোষণা করেছিলেন যে 'জন গণ মন' জাতীয় স্তোত্র হবে এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কারণে 'বন্দে মাতরম' কে সমান সম্মান দেওয়া হবে।
১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি ভারত একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। প্রজাতন্ত্র দিবস হল সেই দিন যেদিন আমরা আমাদের সংবিধান এবং আমাদের জাতীয় পরিচয় উদযাপন করি। যখন রাষ্ট্রপতি রাজপথে (বর্তমানে কর্তব্যের পথ) তেরঙ্গা উত্তোলন করেন এবং ২১টি তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে জাতীয় স্তোত্র বাজানো হয়, তখন সেই মুহূর্তটি দেশের সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। এই গানটি উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে সমুদ্র এবং পশ্চিমে গুজরাট থেকে পূর্বে বাংলা পর্যন্ত ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যকে একত্রিত করে। পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মারাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল এবং বঙ্গের মতো অঞ্চলের উল্লেখ ভারতের অখণ্ডতার প্রতীক।
পরিশেষে, 'জন গণ মন' কেবল একটি গান নয়, বরং ভারতের আত্মার কণ্ঠস্বর। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। ব্রিটিশদের মহিমান্বিত করা কেবল একটি ঐতিহাসিক ভুল ধারণা, যদিও বাস্তবতা হল এই গানটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের গভীর অনুভূতি থেকে উদ্ভূত। এই প্রজাতন্ত্র দিবসে, যখন আমরা জাতীয় স্তোত্র গাইব, এর অর্থ এবং এর পিছনের ত্যাগকে স্মরণ করব, তখনই এটি হবে এর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাঞ্জলি।