মাস শেষ হতে না হতেই মনটা হাঁপিয়ে ওঠে। ব্যাগ গোছাতে ইচ্ছে করে কিন্তু দার্জিলিং-এর হোটেলের রেট দেখে সাহস হয় না। পুরী গেলে গরম আর ভিড়। তাহলে যাবেন কোথায়? ট্রাভেল গ্রুপে এখন একটাই নাম ঘুরছে। সিমডেগা। ঝাড়খণ্ডের এই জায়গাটাকে স্থানীয়রা "ছোটা নাগপুরের রানি" বলে। আর কলকাতা থেকে এটা একদম কাছে। মাত্র ১ রাত ট্রেন জার্নি বা ৮-৯ ঘণ্টা গাড়ি চালালেই পৌঁছে যাবেন একদম অন্য দুনিয়ায়। সবচেয়ে বড় কথা ২ জন মিলে ৩ দিন ঘুরে আসতে খরচ হবে ৫ থেকে ৬ হাজারের মধ্যে।
সিমডেগা গেলে প্রথমেই বুঝবেন এখানে কোলাহল নেই। কংক্রিটের বাড়ি, হকারের চিৎকার, গাড়ির হর্ন, কিছুই নেই। আছে শুধু সবুজ টিলা, ঘন জঙ্গল আর পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝরনা। সকালবেলা ঘুম ভাঙবে পাখির ডাকে। জানলা খুললেই দেখবেন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। বিকেলে দূর থেকে ভেসে আসবে আদিবাসী গ্রামের ঢোল-মাদলের আওয়াজ। আর রাতে কারেন্ট চলে গেলে ঝিঁঝি পোকার ডাকই হবে আপনার মিউজিক। শহরের দমবন্ধ করা জীবন থেকে ৩ দিনের জন্য মুক্তি পেতে এর থেকে ভালো ঠিকানা আর হয় না।
এই জায়গার আসল সৌন্দর্য হল এর প্রকৃতি আর মানুষ। সিমডেগার ৯০ শতাংশ মানুষই আদিবাসী। ওরাওঁ, মুন্ডা, খাড়িয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা এখনও নিজেদের পুরনো নিয়মে জীবন কাটায়। তাই এখানে এলে শুধু ঘোরা হবে না, একটা গোটা সংস্কৃতিকে ছুঁয়ে দেখতে পারবেন। ওদের হাতে বোনা রঙিন শাড়ি, বাঁশ দিয়ে বানানো ঘর-গৃহস্থালির জিনিস, সন্ধেবেলা গোল হয়ে ধুমকুরিয়া নাচ, সবকিছুই আপনার কাছে নতুন লাগবে। ওদের আতিথেয়তাও মনে রাখার মতো।
এবার আসি ঘোরার জায়গায়। সিমডেগা থেকে ১০ কিমি দূরেই আছে কেলাঘাগ ঝরনা। জঙ্গলের সরু রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ সামনে বিশাল ঝরনা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে। বর্ষায় এর রূপ সবচেয়ে সুন্দর। পাথরের উপর বসে ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। তারপর আছে বলদিরি ঝরনা। স্থানীয়রা একে "সিমডেগার নায়াগ্রা" বলে। প্রায় ৫০ ফুট উপর থেকে জল আছড়ে পড়ছে। ঝরনার পাশেই বিশাল ফাঁকা জায়গা। রবিবার এখানে স্থানীয়রা পিকনিক করতে আসে। আপনিও চাইলে ক্যারি করে নিয়ে গিয়ে একটা দিন কাটাতে পারেন।
ইতিহাস আর পুরাণ ভালোবাসলে যেতে হবে রামরেখা ধাম। ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা সীমান্তে অবস্থিত এই জায়গা। কথিত আছে বনবাসের সময় রাম, সীতা আর লক্ষ্মণ এখানে কিছুদিন ছিলেন। এখানে আছে ছোট নদী, পাথরের মন্দির আর চারপাশে পাহাড়। জায়গাটার মধ্যে একটা শান্ত শান্ত ভাব আছে। শুধু এই ৩টে জায়গাই নয়, রাস্তায় যেতে ছোট ছোট টিলা, জঙ্গল আর আদিবাসী গ্রামগুলোই আপনার ট্রিপের আসল পাওনা হয়ে যাবে।
এবার বলি কীভাবে যাবেন। কলকাতার হাওড়া থেকে হাওড়া-বারবিল জনশতাব্দী এক্সপ্রেস বা ইস্পাত এক্সপ্রেস ধরে নেমে পড়ুন চক্রধরপুর স্টেশনে। স্লিপারের ভাড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। চক্রধরপুর থেকে সিমডেগা ২ ঘণ্টার বাস বা শেয়ার জিপ পেয়ে যাবেন। ভাড়া ৭০-৮০ টাকা। থাকার জন্য খুব দামি হোটেল নেই। সরকারি ট্যুরিস্ট লজ আছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায়। আর লোকাল ছোট হোটেল ৫০ টাকাতেই পেয়ে যাবেন। খাওয়া-দাওয়া খুব সস্তা। রাস্তার ধারের হোটেলে গরম ভাত, ডাল, আলু ভাজা আর সবজি ৮০ টাকায় পেট ভরে খাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩ দিন ২ রাত ২ জনের ট্রিপ ৫-৬ হাজারে আরামসে হয়ে যাবে।
কখন যাবেন? অক্টোবর থেকে মার্চ সেরা সময়। আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে, ঘোরার কষ্ট হয় না। বর্ষায় গেলে ঝরনা দেখতে পাবেন ভয়ঙ্কর সুন্দর কিন্তু রাস্তা খুব পিচ্ছিল। আর যাওয়ার আগে ২টো কথা মাথায় রাখবেন। এক, এখানে সব জায়গায় নেটওয়ার্ক পাবেন না। তাই বাড়িতে বলে বেরোবেন। দুই, দয়া করে প্লাস্টিক ফেলবেন না। জায়গাটা এখনও নোংরা হয়নি। আমাদের জন্যই যেন নষ্ট না হয়।
সিমডেগা লাক্সারি ট্রিপের জায়গা নয়। এটা মন আর চোখের শান্তির জায়গা। কম টাকায়, কম সময়ে যদি প্রকৃতির একদম কাছে যেতে চান, যদি ভিড় এড়িয়ে ৩ দিন নিশ্বাস নিতে চান, তাহলে আর দেরি না করে ব্যাগ গোছান।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News