
‘জুরাসিক পার্ক’ দেখে আমরা ভাবি, টি-রেক্স মানেই তেড়ে এসে ট্রাইসেরাটপস শিকার করছে। ৬ টন ওজনের দৈত্য, ১২ মিটার লম্বা, কলা গাছের মতো দাঁত – রাজার মতোই হাবভাব।
কিন্তু আমেরিকার প্যালিওন্টোলজিস্টরা বলছেন, সিনেমার টি-রেক্স আর বাস্তবের টি-রেক্স আলাদা। বাস্তবে ওরা ছিল দারুণ ‘প্র্যাকটিক্যাল’। শিকার জুটল তো ভালো, না জুটলে মরা-পচা, এমনকি নিজের দলের মৃত টি-রেক্সও খেয়ে নিত। আর এই কাজটা সবচেয়ে বেশি করত শাবক ও টিনএজ টি-রেক্সরা।
কীভাবে ধরা পড়ল ডাইনোসরের ‘ক্যানিবালিজম’? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. ক্যারেন চিন ও তাঁর টিম ২০২৪-২৫ ধরে উত্তর আমেরিকার হেল ক্রিক ফর্মেশনে খন চালাচ্ছিলেন। সেখানে ৬৬ মিলিয়ন বছরের পুরনো টি-রেক্সের হাড়গোড় পাওয়া যায়।
৮টা আলাদা টি-রেক্সের হাড়ে তাঁরা অদ্ভুত দাঁতের দাগ পান। দাগগুলো লম্বা, গভীর, ‘U’ শেপের। মাপে মাপে মিলে যাচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্সের দাঁতের সাথে। অন্য কোনও মাংসাশী ডাইনোসর, যেমন র্যাপ্টরের দাঁত এত বড় নয়।
সবচেয়ে চমক, একটা ১২ বছরের কিশোর টি-রেক্সের পায়ের হাড়ে আরেকটা বড় টি-রেক্সের কামড়ের দাগ। আবার একটা বাচ্চা টি-রেক্সের দাঁতের ফসিলে মাইক্রোস্কোপে দেখা গেছে হাড়ের গুঁড়ো। মানে ওরা হাড় চিবিয়ে মজ্জা খেত।
গবেষণা ‘PLOS ONE’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
কেন নিজের প্রজাতিকেই খেত টি-রেক্স? ৩টে কারণ:
১. অপচয় করা চলবে না – ফুড ইজ ফুড ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষ দিকে খাবার কম ছিল। আগ্নেয়গিরি, জলবায়ু পরিবর্তন। ৬ টন দৈত্যের রোজ ২৩০ কেজি মাংস লাগত। এত শিকার রোজ জুটত না। তাই দলের কেউ বার্ধক্য, রোগ বা লড়াইয়ে মারা গেলে বাকিরা সেটাকেই ‘বুফে’ বানাত। শাবকদের জন্য এটা ছিল প্রোটিনের সহজ সোর্স। “বেঁচে থাকতে গেলে ইমোশন চলে না,” বলছেন ড. চিন।
২. শাবকরা শিকার ধরতে পারত না টি-রেক্স ১৮-২০ বছর বয়সে অ্যাডাল্ট হত। ৫-১৪ বছর বয়সী কিশোর টি-রেক্সরা ছিল চিকন, দৌড়াতে পারত, কিন্তু ৫ টনের ট্রাইসেরাটপস মারার শক্তি ছিল না। তাই ওরা ‘স্ক্যাভেঞ্জার’ বা মৃতভোজী হয়ে যেত। বড়রা শিকার করে খাওয়ার পর যা পড়ে থাকত, বা অন্য মরা টি-রেক্স – সেটাই খেত। হাড়ের দাগ বলছে, ওরা শকুনের মতো হাড় কুরে খেত।
৩. টেরিটরি ফাইটের পর ‘ভোজ’ টি-রেক্সরা ভয়ানক টেরিটোরিয়াল ছিল। দুটো অ্যাডাল্ট মারামারি করে একটা মরে গেলে, বিজয়ী বা তার দল মৃতদেহটা খেয়ে ফেলত। এতে দুটো লাভ – পেটও ভরল, প্রতিদ্বন্দ্বীর শরীরটাও ‘নষ্ট’ হল না। জীবাশ্মে কামড়ের দাগের প্যাটার্ন দেখে বোঝা যাচ্ছে, মৃত্যুর পরেই খাওয়া হয়েছে, শুকিয়ে যাওয়ার আগে।
শুধু টি-রেক্স নয়, আরও অনেকে খেত: আগে ভাবা হত, মাজুঙ্গাসরাস নামের ডাইনোসর ক্যানিবাল। এখন দেখা যাচ্ছে অ্যালোসরাস, কয়েলোফাইসিস – অনেক মাংসাশী ডাইনোসরই সুযোগ পেলে নিজের প্রজাতি খেত। এমনকি হিংস্র ‘র্যাপ্টর’ ডাইনোনিকাসও।
‘রাজা’ ইমেজ কি নষ্ট হল? একদম না। বরং বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটাই প্রমাণ করে টি-রেক্স কতটা ‘ইন্টেলিজেন্ট স্ক্যাভেঞ্জার’ ছিল। সুপার শিকারি + সুযোগসন্ধানী মৃতভোজী – দুটো স্কিলই ছিল। তাই ২ কোটি বছর রাজত্ব করেছে। শুধু শিকারের উপর ভরসা করলে না খেয়ে মরত।
আধুনিক কুমির, কোমোডো ড্রাগন, সিংহ – এরাও সুযোগ পেলে নিজের প্রজাতি খায়। এটা প্রকৃতির নিয়ম। ‘Survival of the fittest’।
৪টে মজার ফ্যাক্ট টি-রেক্স নিয়ে: ১. কামড়ের জোর: ৫,৮০০ কেজি। মানে এক কামড়ে গাড়ি দুমড়ে দিতে পারত। হাড় গুঁড়ো করা জলভাত। ২. ঘ্রাণ শক্তি: ৩ কিমি দূর থেকে পচা মাংসের গন্ধ পেত। তাই মৃতদেহ খুঁজে নিত। ৩. শাবক দেখতে অন্যরকম: ছোট টি-রেক্স চিকন, লম্বা পা, দৌড়বাজ। বড় হয়ে মোটা, গাট্টাগোট্টা হত। ৪. পালক ছিল: শেষ বয়সে মুখে-ঘাড়ে হালকা পালক ছিল, পাখির মতো।
শেষ কথা: টি-রেক্স নিষ্ঠুর ছিল না, বাস্তববাদী ছিল। ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে ‘জিরো ওয়েস্ট পলিসি’ মানত। আমরা ফ্রিজে খাবার পচাই, আর ওরা মরা ভাইকেও নষ্ট হতে দিত না।
তাই পরের বার ‘জুরাসিক পার্ক’ দেখলে মনে রাখবেন, দাঁত-নখ বের করে তেড়ে আসা টি-রেক্সটা হয়তো গতকাল নিজেরই দলের কাউকে ডিনার করেছে।
কারণ জঙ্গলের নিয়ম একটাই – ‘খাও অথবা খাদ্য হও’। ডাইনোসরের রাজারাও তার বাইরে নয়।
Lifestyle Tips & Articles in Bangla (লাইফস্টাইল নিউজ): Read Lifestyle Tips articles & Watch Videos Online - Asianet Bangla News