
আমেরিকা ও ইজরায়েল ফের হামলা চালালে পাল্টা জবাব দিতে সমুদ্রের নীচে থাকা ইন্টারনেট কেবলকে নিশানা করার পরিকল্পনা করেছে ইরান। এমনই দাবি করেছেন ইরানের দুই শীর্ষ নিরাপত্তা আধিকারিক। তাঁদের বক্তব্য, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর নীচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেবলগুলিতে হামলা চালানো হতে পারে। এর ফলে ইন্টারনেট পরিষেবা, আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খবর রয়টার্সের। তবে এর অর্থ এই নয় যে কেবল কেটে দিলেই গোটা বিশ্বের ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। বিকল্প কেবল ও স্থলপথে ডেটা পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করবে কতগুলি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিকল্প নেটওয়ার্ক কতটা চাপ সামলাতে পারছে, তার উপর।
আমরা মোবাইলে WhatsApp-এ মেসেজ পাঠানো, YouTube-এ ভিডিও দেখা, অনলাইনে টাকা পাঠানো কিংবা ক্লাউডে তথ্য সংরক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্টারনেটের উপর নির্ভর করি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ডেটা আদানপ্রদান হয় সমুদ্রের নীচে পাতা ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (ITU) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের প্রায় ৯৯ শতাংশ এই ধরনের কেবলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এই কেবলগুলিতে ক্ষতি হলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগের গতি কমে যেতে পারে এবং ডিজিটাল পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমুদ্রপথের নীচ দিয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কেবলও গিয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ বজায় রাখতে এগুলির ভূমিকা রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের দুই নিরাপত্তা আধিকারিক জানিয়েছেন, আমেরিকা ও ইজরায়েল ফের হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রের নীচে থাকা যোগাযোগ কেবলগুলিকে নিশানা করা হতে পারে। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডসের এক আধিকারিকও হরমুজ প্রণালীর নীচে থাকা সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট কেবলের কথা উল্লেখ করেছেন।
- WhatsApp: আন্তর্জাতিক ডেটা সংযোগে সমস্যা হলে মেসেজ পাঠানো, ছবি-ভিডিও শেয়ার এবং ভয়েস-ভিডিও কলে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
- YouTube: ভিডিও লোড হতে দেরি হতে পারে, স্ট্রিমিংয়ের গতি কমতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে।
- UPI পেমেন্ট: ইন্টারনেট সংযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্কে সমস্যা হলে অনলাইন লেনদেন আটকে যেতে পারে বা ব্যর্থ হতে পারে।
- ক্লাউড ও AI পরিষেবা: বিদেশের ডেটা সেন্টারের সঙ্গে সংযোগে সমস্যা হলে ক্লাউড পরিষেবা এবং কিছু AI-ভিত্তিক পরিষেবা ব্যবহারে অসুবিধা হতে পারে।
তবে বিকল্প নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডেটা অন্য পথে পাঠানো সম্ভব। ফলে পরিষেবা কতটা ব্যাহত হবে, তা নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত কেবলের সংখ্যা এবং বিকল্প সংযোগের ক্ষমতার উপর।
ভারত আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের জন্য একাধিক সমুদ্রতলের কেবল ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (TRAI) ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১৪টি কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনে প্রায় ১৭টি সাবমেরিন কেবল এসে যুক্ত হয়েছিল। মুম্বই ও চেন্নাইয়ে এই ধরনের পরিকাঠামোর বড় অংশ রয়েছে। হরমুজ প্রণালীর কেবলগুলিতে বড় ধরনের ক্ষতি হলে আন্তর্জাতিক ডেটা চলাচলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তার প্রভাব ভারতের কিছু ইন্টারনেট পরিষেবা, অনলাইন লেনদেন ও বিদেশি সার্ভারের উপর নির্ভরশীল ব্যবসায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ভারতের সমস্ত ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই। সমুদ্রের নীচে থাকা কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মেরামত করা সময়সাপেক্ষ। বিশেষ জাহাজের সাহায্যে কেবল সমুদ্রের উপরিভাগে তুলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ বদলাতে হয়। যুদ্ধ চলাকালীন সমুদ্রপথে নিরাপত্তার ঝুঁকি, বিমার খরচ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি পেতে দেরি হওয়ার কারণে মেরামতের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প পথে ডেটা পাঠানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে একাধিক কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর নীচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের এক শতাংশেরও কম প্রবাহিত হয়। তাই এই অঞ্চলের কেবলগুলিতে হামলা হলে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে আঞ্চলিক সংযোগ ও পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাই বেশি। অর্থাৎ, ইরানের এই হুঁশিয়ারি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ডেটা চলাচলে চাপ তৈরি হতে পারে। কিন্তু WhatsApp, YouTube কিংবা UPI-সহ সব পরিষেবা নিশ্চিতভাবে বন্ধ হয়ে যাবে—এমন দাবি করার মতো তথ্য এখনও নেই।