দুর্গাপুজোয় মিলবে না মাছ-মাংস! ভাগেশ্বর বাবার মন্তব্য নিয়ে ঝড়, কী জানাল ভারতীয় হিন্দু পরিষদ?

Published : Sep 07, 2026, 08:56 PM IST
Durga Puja Special

সংক্ষিপ্ত

৬ সেপ্টেম্বর হাওড়ার লিলুয়ায় হনুমান কাহিনীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাংলার হিন্দুদের উদ্দেশে নবরাত্রির সময় দুর্গাপ্রতিমার আশপাশে ননভেজ খাবার বিক্রি বন্ধ করার আবেদন জানান।

দুর্গাপুজো বাংলার কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক স্মৃতি, পাড়া-প্রতিবেশীর মিলন, খাওয়া-দাওয়া, শিল্প, সংগীত এবং বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথা। তাই দুর্গাপুজোর সঙ্গে মাছ-মাংসের সম্পর্ক নিয়ে কোনও মন্তব্য উঠলে তা অনেক সময় শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা পৌঁছে যায় ধর্মীয় বিশ্বাস, আঞ্চলিক ঐতিহ্য এবং বাঙালি পরিচয়ের গভীর আলোচনায়। এবারের দুর্গাপুজো শুরু হওয়ার আগেই সেই বিতর্কই নতুন করে সামনে এসেছে। ৬ সেপ্টেম্বর হাওড়ার লিলুয়ায় হনুমান কাহিনীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাংলার হিন্দুদের উদ্দেশে নবরাত্রির সময় দুর্গাপ্রতিমার আশপাশে ননভেজ খাবার বিক্রি বন্ধ করার আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, কেউ প্রতিমা স্থাপন না করলেও এই বিষয়টির দিকে নজর রাখা উচিত।

শাস্ত্রীর এই মন্তব্যের পরেই শুরু হয় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক। কারণ, বাংলায় দুর্গাপুজোর সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক একরৈখিক নয়। কোথাও সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগের প্রচলন রয়েছে, আবার কোথাও মাছ বা মাংসের সঙ্গে পুজোর দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক ধারণা কি বাংলার সমস্ত দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হতে পারে?

শাস্ত্রীর বক্তব্যের কয়েক দিন আগেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা VHP দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের আশপাশে ননভেজ খাবার থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। সেই বক্তব্যও যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করে।

পরবর্তীতে VHP স্পষ্ট করে জানায়, তাদের উদ্দেশ্য আমিষ খাবারের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়। বাংলার মানুষ কী খাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াও তাদের উদ্দেশ্য নয় বলে তারা জানায়।

তবুও বিতর্ক থামেনি। কারণ, এই ঘটনাকে অনেকে শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট খাবার বিক্রি বা খাওয়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না। এর মধ্যে উঠে আসছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—ধর্মীয় উৎসব পালনের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কতটা স্বাধীনতা থাকা উচিত?

বাস্তবতা হল, বাংলার দুর্গাপুজোর কোনও একক রীতি নেই।

একটি বাড়ির পুজোর সঙ্গে অন্য একটি বাড়ির পুজোর পার্থক্য থাকতে পারে। বনেদি বাড়ির পুজো, বারোয়ারি পুজো, গ্রামের পুজো কিংবা শহরের থিম পুজো—প্রতিটির নিজস্ব ইতিহাস ও আচার রয়েছে।

কোথাও দেবীর উদ্দেশে নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। আবার কিছু ঐতিহ্যে মাছ বা মাংস পুজোর সঙ্গে যুক্ত। কোথাও খাদ্য একটি ধর্মীয় আচারের অংশ, কোথাও তা মূলত পুজোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামাজিক সংস্কৃতির অংশ।

এই বৈচিত্র্যই বাংলার দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এই কারণেই প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়-সহ অনেকে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের যুক্তি, হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল তার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য। দেশের এক প্রান্তের ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিকে অন্য প্রান্তের মানুষের উপর একইভাবে প্রয়োগ করা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটিই এখানে মূল প্রশ্ন।

বাংলার সংস্কৃতিতে খাবার শুধুমাত্র পেট ভরানোর বিষয় নয়। মাছ-ভাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবের বিশেষ রান্না—খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির সামাজিক জীবন, পারিবারিক স্মৃতি এবং আঞ্চলিক পরিচয়।

দুর্গাপুজোর সময়ও বহু পরিবারে অষ্টমী, নবমী বা দশমীর খাবারের নিজস্ব রীতি রয়েছে। কোথাও নিরামিষ রান্না, কোথাও বিশেষ মাছের পদ, আবার কোথাও মাংস রান্না—সবই বিভিন্ন পরিবার ও সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের অংশ।

এই কারণেই পুজোর প্যান্ডেলের আশেপাশে ননভেজ খাবার বিক্রি করা উচিত কি না—এই প্রশ্নটি অনেকের কাছে নিছক ব্যবসা বা খাদ্যাভ্যাসের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে ‘কোনটা বাঙালির সংস্কৃতি’ এবং ‘কোনটা ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য’—এই দুই প্রশ্ন।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই বিতর্কের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে BJP সরকার গঠনের পর এটি প্রথম দুর্গাপুজো। নির্বাচনের আগে BJP-কে ঘিরে বিরোধীদের একটি বড় অভিযোগ ছিল—দলের নেতৃত্ব বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক ঐতিহ্যের উপর বাইরের কোনও দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিতে পারে।

এই অভিযোগের মোকাবিলায় নির্বাচনী প্রচারে BJP নেতাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছিল বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাস। মাছ-ভাতকেও বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

সেই প্রেক্ষাপটে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্য BJP-এর জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে—এমন রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।

তবে রাজ্য BJP নেতৃত্ব সরাসরি শাস্ত্রীর বক্তব্যকে দলের অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করেনি। প্রদেশ BJP সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য তাঁকে সম্মানিত সাধু হিসেবে উল্লেখ করলেও তাঁর বক্তব্যকে ব্যক্তিগত মতামত বলে ব্যাখ্যা করেছেন।

একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বাঙালির নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের খাবারেরই জায়গা রয়েছে। অষ্টমীর পূরী থেকে নবমীর মাটন—উৎসবকে ঘিরে এই খাদ্যসংস্কৃতিও বাংলার সামাজিক বাস্তবতার অংশ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই এই বিতর্ককে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা ধরনের আলোচনা, বিদ্রূপ এবং মিম। কিন্তু তার আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।

দুর্গাপুজো কি শুধুই নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় আচারের নাম? নাকি এটি এমন এক সাংস্কৃতিক পরিসর, যেখানে বাংলার বিভিন্ন পরিবার, সম্প্রদায় এবং অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্যও সমানভাবে জায়গা পায়?

সম্ভবত বাংলার দুর্গাপুজোর শক্তি তার বৈচিত্র্যেই। কেউ নিরামিষ ভোগ দেবেন, কেউ নিজের পারিবারিক রীতি মেনে অন্য খাবার রান্না করবেন—এই পার্থক্যগুলিই তো বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ।

তাই মাছ-মাংস নিয়ে বর্তমান বিতর্ককে শুধুমাত্র ‘ননভেজ খাবার চলবে কি চলবে না’—এই সরল প্রশ্নে আটকে রাখলে বিষয়টির আসল গুরুত্বটাই হয়তো হারিয়ে যাবে। আসল আলোচনা হওয়া উচিত—ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করার পাশাপাশি কীভাবে বাংলার নিজস্ব আঞ্চলিক ঐতিহ্য, খাদ্যসংস্কৃতি এবং বৈচিত্র্যকেও সম্মান করা যায়।

কারণ বাংলার দুর্গাপুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়; এটি একই সঙ্গে বাঙালির স্মৃতি, সংস্কৃতি, উৎসব এবং পরিচয়েরও একটি বড় অংশ।

PREV

West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.

Read more Articles on
click me!

Recommended Stories

কথা রাখলেন শুভেন্দু, বার্ধক্য থেকে বিধবা ভাতা বাড়িয়ে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
Durga Puja Grant: বড় পুজোর অনুদান বন্ধ? কারা পাবে ১ লাখ টাকা? কী ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর?