
Social Work: দুর্গাপুজোয় (Durga Puja 2026) দশভুজা মা দুর্গা অসুরদলনী, শক্তির প্রতীক, অশুভের বিনাশকারী। তাঁর দশ হাতে দশ অস্ত্র, আর সেই হাতেই ভক্তরা খুঁজে পান বিপদ থেকে মুক্তির আশ্বাস। কিন্তু বাস্তবের পৃথিবীতে এমনও কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের হাতে কোনও অস্ত্র নেই, নেই দেবীর মতো দশটি হাত। অথচ তাঁদের দু’টি হাতেই যেন লুকিয়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন, নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার আশা আর বিপদের দিনে মাথার উপর ভরসার একটুকরো ছাদ। তিস্তা বঙ্গের ছোট্ট একটি জেলা জলপাইগুড়ির পান্ডাপাড়া-বৌবাজার অঞ্চলের পম্পি সূত্রধর যেন তেমনই এক বাস্তবের উমা! কারও রক্তের প্রয়োজন, কারও চিকিৎসার খরচ জোগানোর অসহায়তা, কারও মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দেওয়ার আর্তি মানুষের এমনই হাজারও সংকটে ছুটে যান তিনি। আর তাঁর এই মানবিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে আরও এক বিস্ময়কর কাহিনি। অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana) থেকে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশই অসহায় মানুষের সাহায্যে ব্যয় করেন বলে দাবি পম্পির।
মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন কোনও রোগী। চিকিৎসক জানিয়েছেন, অবিলম্বে রক্তের প্রয়োজন। অথচ পরিবারের লোকজন হন্যে হয়ে ঘুরেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রক্ত। হাসপাতালের করিডরে উদ্বেগ, চোখে জল, মনে একটাই প্রশ্ন প্রিয় মানুষটিকে কি বাঁচানো যাবে? এমন পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারের কাছেই আশার নাম হয়ে উঠেছেন পম্পি। বিশেষ করে নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপের রক্ত কিংবা অত্যন্ত বিরল ‘বম্বে ব্লাড গ্রুপ’-এর সন্ধান পেতে যখন রোগীর পরিবার দিশাহারা হয়ে পড়ে, তখন বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে রক্তের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন তিনি। প্রয়োজনে ভিনরাজ্য থেকেও রক্ত সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছেন বলে তাঁর দাবি। এমনকী, মুম্বই থেকেও রক্ত জোগাড়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পম্পি। রক্তের প্রয়োজনের খবর পেলেই যতটা সম্ভব দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর কাছে মানুষের বিপদ মানে শুধুই একটি ফোনকল নয়, বরং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার আকুতি। তাই সময়-অসময়ের হিসেব না কষে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর কাছে বড় দায়িত্ব।
পম্পির মানবিকতার গল্পের সবচেয়ে আবেগঘন দিকটি লুকিয়ে রয়েছে তাঁর উপার্জন ও প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহারের ভাবনায়। অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের সাহায্যে ব্যয় করেন বলে দাবি তাঁর। নিজের প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে থেকেও অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যে অর্থ নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও কাজে লাগতে পারত, সেই অর্থের একটি অংশ দিয়ে যদি কারও মুখে খাবার তুলে দেওয়া যায়, কোনও শিশুর হাতে পড়াশোনার সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া যায় কিংবা কোনও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সামান্য সাহায্য করা যায়, তা হলে তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? পম্পির কাজ যেন সেই প্রশ্নই তুলে ধরে। চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রান্তিক মানুষ, অসহায় শিশু থেকে শুরু করে রাস্তায় থাকা অভুক্ত মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। কখনও খাদ্যসামগ্রী, কখনও পোশাক, কখনও আবার শিশুদের পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেন। তাঁর এই উদ্যোগে প্রচারের চাকচিক্যের চেয়ে মানুষের প্রয়োজনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মানবিকতার আরও একটি নজির মিলেছে সম্প্রতি। ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন এক ব্যক্তি। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসার খরচ বহন করা থেকে শুরু করে সুস্থ হওয়ার পর বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা সবকিছু নিয়েই তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। সেই কঠিন সময়ে ওই ব্যক্তির পাশে দাঁড়ান পম্পি। শুধু সহানুভূতি জানিয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি। ওই ব্যক্তির চিকিৎসার খরচ বহনের দায়িত্ব নেন এবং চিকিৎসা শেষ হলে তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন বলে জানা গিয়েছে। বিপদের দিনে যখন অনেকেই অসহায় মানুষের পাশ কাটিয়ে চলে যান, তখন একজন অপরিচিত মানুষের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার এই উদ্যোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অসুস্থতার যন্ত্রণা যেমন কঠিন, তেমনই কঠিন চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা। তার উপর দুর্ঘটনায় আহত কোনও মানুষের পাশে যদি পরিবারের লোকজন না থাকেন, তা হলে সেই লড়াই আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে পম্পির উদ্যোগ একজন অসহায় মানুষের কাছে শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, বরং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহসও জোগাতে পারে।
রক্তের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রক্তদান নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছেন পম্পি। তাঁর ভাবনায়, রক্তদান কেবল একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়, এটি এমন একটি মানবিক উদ্যোগ, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের অনেক সময় নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়। তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের দীর্ঘ লড়াইয়ে রক্তদাতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বাস্তবতা থেকেই রক্তের প্রয়োজন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং বিপদের সময় দ্রুত রক্তের সন্ধান দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। পম্পির কথায়, জরুরি মুহূর্তে এক ব্যাগ রক্ত শুধু একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনাই তৈরি করে না, সেই সঙ্গে স্বস্তি ফিরিয়ে দেয় একটি পরিবারের মুখে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীর সঙ্গে লড়াই করেন তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। তাঁদের চোখের জল মুছে দেওয়ার সামান্য সুযোগ পেলেও সেটাই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। অন্যের বিপদে যিনি ছুটে যান, তাঁর নিজের জীবনেও যে কঠিন সময় আসেনি, তা নয়। পম্পি জানিয়েছেন, একসময় তাঁর বাবাকে ভেন্টিলেশনে রাখতে হয়েছিল। পরিবারের কাছে সেটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও উদ্বেগের সময়। প্রিয়জনের অসুস্থতা, চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তা এই পরিস্থিতির যন্ত্রণা তিনি নিজের জীবনেই অনুভব করেছেন। কিন্তু এমন কঠিন সময়েও অন্য মানুষের জন্য রক্তের ব্যবস্থা করার কাজ থেকে সরে আসেননি বলে জানান পম্পি। নিজের পরিবারের সংকটের মধ্যেও অন্যের বিপদের কথা ভাবার এই অভিজ্ঞতা তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের আর একটি দিক তুলে ধরে। মানুষের অসহায়তা কতটা গভীর হতে পারে, তা হয়তো নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই উপলব্ধি করেছেন তিনি। আর সেই উপলব্ধিই তাঁকে বারবার অন্যের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে।
দুর্গাপুজোর সময় আমরা মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা করি। ফুল, ধূপ, প্রদীপ আর মন্ত্রোচ্চারণে ভরে ওঠে চারপাশ। কিন্তু দেবীর শক্তি, সাহস ও মমতার যে বার্তা, তা যদি বাস্তব জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে, তবেই কি উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য পূর্ণতা পায় না? পম্পির কর্মকাণ্ড সেই ভাবনাকেই সামনে নিয়ে আসে। তাঁর হাতে দশটি অস্ত্র নেই, নেই অসুরদমনের পৌরাণিক ক্ষমতা। রয়েছে মাত্র দু’টি হাত, মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা এবং অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা। সেই হাতেই কখনও পৌঁছে যায় রক্তের সন্ধান, কখনও চিকিৎসার সহায়তা, কখনও খাবার, কখনও বা কোনও শিশুর পড়াশোনার সামগ্রী। তাই তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক মানবিক উপমা দশভুজা দুর্গার মতোই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছেন বাস্তবের এই ‘উমা’। অবশ্য পৌরাণিক দেবীর সঙ্গে তাঁর তুলনা প্রতীকী তাঁর কাজের আসল পরিচয় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই। দেবী দুর্গার পুজোয় যখন চারদিকে আরাধনার আবহ, তখন পম্পির মতো মানুষের কর্মকাণ্ড যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক ধরনের পুজো। অসহায় মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে দেবী আরাধনার এক অনন্য মানবিক রূপ। জলপাইগুড়ির পম্পির গল্প তাই শুধু একজন সমাজকর্মীর গল্প নয়, বরং মনে করিয়ে দেওয়া এক মানবিক বার্তা বড় কিছু করার জন্য দশটি হাতের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল মন এবং বিপদে পড়া মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সাহস। অন্নপূর্ণার অর্থ হোক কিংবা নিজের সামর্থ্যের সামান্য অংশ সেই সাহায্য যদি কোনও মানুষের মুখে হাসি ফোটায়, কোনও পরিবারকে নতুন করে আশার আলো দেখায়, তা হলে সেই মানবিক উদ্যোগই হয়ে ওঠে উৎসবের প্রকৃত শক্তি।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.