West Bengal News: রাজ্যের নানা প্রান্তে এখনও অনেক মানুষ আছেন যাঁরা নির্লোভ, বর্তমান সময়ে ব্যতিক্রমী। যাঁরা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বদলে নিজের মতো করে জীবন কাটাতে ভালোবাসেন। জলপাইগুড়িতে এমনই এক ব্যতিক্রমী মানুষ আছেন, যাঁকে নিয়ে সারা শহরে আলোচনা চলে।
KNOW
West Bengal News: এ এক অদ্ভুত জীবনযাত্রা। নিজের চোখে না দেখলে কিংবা সরেজমিনে তদন্ত না করলে বিশ্বাস করা কঠিন। কখনও শুনেছেন, কোনও মানুষ বিগত ২৪ বছর ধরে সমাজের আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করেননি? ২৪টি বছর তিনি কাটিয়ে দিচ্ছেন চেনা সামাজিক নিয়মের একেবারে বাইরে গিয়ে। এই ব্যক্তির দাবি দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে তিনি ভাত খাননি। ফলমূল আর ভারী খাবার বলতে কেবল আটার রুটি খেয়েই পার করে দিয়েছেন এতগুলো বছর! আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত সভ্যতার এই যুগেও তাঁর পোশাক বলতে শরীরে জড়িয়ে রাখার জন্য একটি গামছা আর মাথায় বাঁধার জন্য আরেকটি গামছা। ব্যস, এভাবেই চলছে তাঁর দৈনন্দিন জীবন। শুনতে অবাক লাগলেও এটিই বাস্তব।
জলপাইগুড়ির ‘আশ্চর্য মানুষ’
যাঁর বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে, সেই কমল রায়ের বাড়ি জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি ব্লকের গোসাইহাটে। বর্তমানে ৪৫ বছর বয়সি কমলের সংসারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী, মা এবং দুই কন্যা সন্তান। সংসারের রুজি-রুটির টানে ধুপগুড়ি সুপার মার্কেটে ভোর পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ফল ব্যবসা করেন তিনি। উত্তরবঙ্গের এই অন্যতম ব্যস্ত কাঁচা সবজির বাজারে প্রত্যেকেই তাঁকে একজন সুপরিচিত ও দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে চেনেন। ভাবছেন তো, এতে নতুনত্ব কোথায়? আসল অভিনবত্ব লুকিয়ে আছে তাঁর যাতায়াতের মাধ্যমে। বিগত ২৪ বছর ধরে গ্রামের মেঠো পথ থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ততম জাতীয় সড়ক কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতায় গিজগিজ করা সুপারমার্কেট সর্বত্রই তিনি সাইকেল চালান সম্পূর্ণ হাত ছেড়ে! শুধু দুহাত ছেড়ে সাইকেল চালানোই নয়, তাঁর এই নিত্যদিনের সফরের অবিকল্প সঙ্গী একটি বাঁশের বাঁশি। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কিংবা বাড়ি ফেরার পুরো সময়টা জুড়েই তিনি হাত না ছুয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে সুর তোলেন তাঁর প্রিয় বাঁশিতে। বিগত দুই দশক বা তারও বেশি সময় ধরে ধুপগুড়িবাসী তাঁর এই অদ্ভুত কসরত আর সুরের মেলবন্ধন দেখছেন, যা আজ তাঁকে এই অঞ্চলের এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। বিগত ২৪ বছর আগে যিনি আমাদের মতোই এক সাধারণ মানুষ ছিলেন, আজ তিনি এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব।
কীভাবে কমলের জীবনে বদল এল?
ধূপগুড়ির ফল বিক্রেতা কমলের এই আকস্মিক পরিবর্তনের নেপথ্য কাহিনীটি বেশ অলৌকিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক। যদিও নিজের বিষয়ে তিনি খুব বেশি প্রচার চান না, তবুও জানা যায় যে স্কুল জীবনেই তার জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। একদিন স্বপ্নে তিনি পরম পূজনীয় দেবতা শ্রী কৃষ্ণ ও মহাশক্তি মা কালীর স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বর্গীয় বার্তার পর থেকেই প্রথাগত সামাজিক জীবনের বৃত্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে আধ্যাত্মিক দুনিয়ায় সমর্পণ করেন কমল বাবু। এমনকী, তাঁর পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাস সব কিছুই পরিচালিত হয় দৈব নির্দেশিকায়। তবে কমলের বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি আধ্যাত্মিকতাকে আঁকড়ে ধরে বাস্তব সংসার ধর্মকে কখনও অবহেলা করেননি। কেবল সাধনায় মগ্ন না থেকে নিজের বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সংসার টিকিয়ে রাখতে তিনি 'কর্মই ধর্ম' নীতিকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। বর্তমানে ধূপগুড়ি সুপারমার্কেটে তিনি একজন অত্যন্ত সুপরিচিত এবং বড় মাপের ফল ব্যবসায়ী। বাজারে আর পাঁচটা সাধারণ ব্যবসায়ীর চেয়ে তার সততা ও জীবনধারা সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায়, তাঁর ব্যবসায় কখনও মন্দা আসে না। একদিকে গভীর আধ্যাত্মিক চেতনা, অন্যদিকে কঠোর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালনএই দুইয়ের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে তার জীবনে। এই ব্যতিক্রমী জীবনসংগ্রাম ও অনন্য ব্যক্তিত্বের কারণেই আজ কেবল ধূপগুড়ি নয়, সমাজ মাধ্যম-সহ সারা জেলা জুড়েই কমল এক অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


