
কলকাতা ও শহরতলি মিলিয়ে মোট ২৮টি বিধানসভা আছে। যে দলই রাজ্যে ক্ষমতায় আসুক না কেন এই ২৮টি আসন শুধু আসন সংখ্যার বিচারেই নয়, রাজনৈতিক তাৎপর্যেরর ক্ষেত্রেও অপরিসীম। কলকাতা শহরের ১১টি-র পাশাপাশি শহরতলি বা মহানগর লাগোয়া আরও ১৭টি বিধানসভা আসনের দিকে তাকিয়ে গোটা রাজ্য। শহুরে মধ্যভিত্ত, শ্রমজীবী ও বস্তি এলাকার মানুষদের রায়ের ওপর নির্ভর করবে এই আসনগুলির জয়-পরাজয়। আসুন দেখে নেওয়া যাক, শহরতলির ১২টি বিধানসভা আসনের রায় কোন দিকে যেতে পারে।
টালিগঞ্জ বিধানসভা আসন
প্রধান প্রার্থীরা- অরূপ বিশ্বাস (তৃণমূল), পাপিয়া অধিকারী (বিজেপি), পার্থপ্রতিম বিশ্বাস (সিপিএম)।
ফ্য়াক্টর-- বিরোধী ভোট একজোট হলে চাপে পড়়বেন অরূপ বিশ্বাস। তৃণমূলের দলীয় কোন্দলে চাপে অরূপ। এলাকা জুড়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া, নাগরিক পরিষেবা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। সব মিলিয়ে অরূপকে ভোট ময়দানে এর আগে এত চাপে পড়তে হয়নি।
গতবারের ফল- তৃণমূলের মন্ত্রী প্রার্থী অরূপ বিশ্বাস ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বিজেপির বাবুল সুপ্রিয়-কে। বামেদের এখানে ২১ শতাংশের কাছাকাছি ভোট রয়েছে।
প্রচারে কে কোথায়
দেওয়াল লিখনে সমানে সমানে রয়েছেন অরূপ বিশ্বাস ও পাপিয়া অধিকারী। পথ সভায় এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে বাম প্রার্থী পার্থ প্রতিম বিশ্বাসকে।
যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- দেবব্রত মজুমদার (তৃণমূল), বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য (সিপিএম), শর্বরী মুখোপাধ্যায় (বিজেপি)।
ফ্য়াক্টর-- বাম ভোট। তৃণমূল, সিপিএমের মধ্যে ভোট ভাগাভাগিতে সুবিধা পেয়ে যেতে পারেন বিজেপির অভিনেত্রী প্রার্থী শর্বরী।
গতবারের ফল- তৃণমূলের দেবব্রত মজুমদার প্রায় ৩৯ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী-কে। বিজেপি গতবার এই কেন্দ্রে তিন নম্বরে ছিল।
প্রচারে কে কোথায়- বিদায়ী বিধায়ক দেবব্রতকে সমানে চ্য়ালেঞ্জ দিচ্ছেন সিপিএমের বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। গতবারের চেয়ে যাদবপুরে বিজেপির প্রচার ভাল দেখা যাচ্ছে।
কসবা বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- জাভেদ খান (তৃণমূল), শায়নদীপ ব্যানার্জি (বিজেপি), দীপু দাস (সিপিএম), হাসিম জেহসান আহমেদ (কংগ্রেস)
ফ্য়াক্টর-- তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, নাগরিক পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ, প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ার ফায়দা কতটা নিতে পারবে বিরোধীরা।
গতবারের ফল- গত তিনটি বিধানসভা ভোটে এই আসনে বড় ব্যবধানে জিতে আসছেন তৃণমূলের জাভেদ খান।
প্রচারে কে কোথায়- জাভেদ খান প্রচারে এগিয়ে। তবে বিজেপি এবার এখানে প্রচারে চমক দিচ্ছে। তুলনায় গতবারের চেয়ে এখানে বামেদের প্রচার যেন বেশ কিছু এলাকায় ফিকে দেখাচ্ছে।
বেহালা পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- শুভাশীষ চক্রবর্তী (তৃণমূল), শংকর শিকদার (বিজেপি), নিলয় মজুমদার (সিপিএম)।
ফ্য়াক্টর--তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, এলাকার মানুষের পৌর পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ, তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা।
গতবারের ফল- ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে তৃণমূলের জয়ী প্রার্থী রত্না চ্য়াটার্জি-কে বেশ সমস্যায় ফেলেছিলেন বিজেপির অভিনেত্রী-প্রার্থী পায়েল সরকার। পূর্ব বেহালায় বিজেপির সাংগঠনিক জোর বেড়েছে। তবে শেষ মুহর্তে প্রার্থী বদলে বিজেপি কিছুটা চাপে পড়েছে।
প্রচারে কে কোথায়- দেওয়াল লিখন, বিল বোর্ড, ফ্লেক্স প্রচারে এগিয়ে তৃণমূল। রোড শো-এর সংখ্য়াতেও এগিয়ে জোড়া ফুল। তবে পথসভা, ছোট প্রচারে চমক দিচ্ছে বিজেপি। সিপিএম এখানে কিছু ওয়ার্ডে ভাল প্রচার চালাচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে এই আসনে লড়াইটা সীমাবদ্ধ থাকবে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্য়েই।
বেহালা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- রত্না চট্টোপাধ্য়ায় (তৃণমূল), ইন্দ্রনীল খাঁ (বিজেপি), নিহার ভক্ত (সিপিএম)।
ফ্য়াক্টর-- পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতি, নাগরিক পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ, জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি।
গতবারের ফল- গতবার বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন তৃণমূলের পার্থ চট্টোপাধ্য়ায় (প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল প্রায় ৫০ শাতংশ)। সেখানে দ্বিতীয় স্থানে বিজেপির অভিনেত্রী প্রার্থী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ২৭ শতাংশ ও সিপিএমের নিহার ভক্ত ২০ শতাংশ ভোট।
প্রচারে কে কোথায়- দেওয়াল লিখন থেকে জনসভায় এগিয়ে রত্না চট্টোপাধ্যায়। তবে ছোট পথ সভা, সাইকেল নিয়ে প্রচার, বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগে এগিয়ে আছেন বাম প্রার্থী নিহার ভক্ত। এই আসনে বিজেপির সাইলেন্ট ভোটার অনেক। তাই বিজেপির প্রচার কতটা তা দেখে এই আসনের ফলের ইঙ্গিত পাওয়া কঠিন।
দমদম বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- ব্রাত্য বসু (তৃণমূল), অরিজিৎ বক্সি (বিজেপি), ময়ূখ বিশ্বাস (সিপিএম), সুস্মিতা বিশ্বাস (কংগ্রেস)।
ফ্য়াক্টর-- মন্ত্রীকে নিয়ে ক্ষোভ, এলাকার সমস্যায় ব্রাত্যর অনুপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া, বিরোধী ভোটের ভাগ।
গতবারের ফল- গত তিনটি বিধানসভা এই আসন থেকে জিতে আসছেন তৃণমূলের মন্ত্রী-প্রার্থী ব্রাত্য বসু। গতবার ব্রাত্য জিতেছিলেন প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে। সেখানে প্রধান দুই বিরোধী দলের মিলিত ভোট ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের ছিল ৩৩ শতাংশ।
প্রচারে কে কোথায়
সমানে সমানে টক্কর চলছে। মন্ত্রীর আসন হওয়ায় এখানে তৃণমূলের প্রচারের ঢাকের আওয়াজ বেশি। কিন্তু বিজেপি এক ইঞ্চি জমি প্রচারে ছাড়ছে না। বাম তরুণ প্রার্থী ময়ূখের প্রচারে দলীয় কর্মীদের মধ্যে উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে।
দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (তৃণমূল), দীপ্সিতা ধর (সিপিএম), সৌরভ সিকদার (বিজেপি)।
ফ্য়াক্টর-- বিরোধীদের ভোটব্য়াঙ্ক ভাগ, তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।
গতবারের ফল- তৃণমূলের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য গতবার ২৮ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন বিজেপির অর্চনা মজুমদার-কে। সেখানে তৃতীয় হওয়া সিপিএমের তন্ময় ভট্টাচার্য সাড়ে ৪৫ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে চন্দ্রিমাকে হারিয়েছিলেন সিপিএমের তন্ময় ভট্টাচার্য।
প্রচারে কে কোথায়- তিনটি দলই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। জনসংযোগে এগিয়ে দীপ্সিতা, দেওয়াল লিখনে চন্দ্রিমা আর রোড শোয়ে বিজেপি সৌরভ সিকদার।
রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- অদিতি মুন্সি (তৃণমূল), তরুণজ্য়োতি তিওয়ারি (বিজেপি), শুভজিৎ দাশগুপ্ত (সিপিএম), পার্থ ভৌমিক (কংগ্রেস)।
ফ্য়াক্টর-- প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়াটা কতটা কাজে লাগাতে পারবেন বিরোধীরা।
গতবারের ফল- তৃণমূলের অদিতি মুন্সি প্রথমবার ভোটে লড়ে প্রায় ২৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী শমীক ভট্টাচার্য-কে।
প্রচারে কে কোথায়- অদিতির প্রচারকে সমানে পাল্লা দিচ্ছেন বিজেপির তরুণজ্যোতি।
রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা-তাপস চট্টোপাধ্যায় (তৃণমূল), পীযুষ কানোড়িয়া (বিজেপি), সপ্তর্ষী দেব (সিপিএম)।
ফ্য়াক্টর-- তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে চাপে তাপস। গতবার এই আসনে ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রায় ৫৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন তৃণমূলের তাপস। বিজেপি প্রার্থী সেখানে ৩০ শতাংশ ও সিপিএমের প্রার্থী ১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
গতবারের ফল- গতবার এই আসনে
প্রচারে কে কোথায়- সমানে সমানে প্রচার চলছে।
বিধাননগর বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- সুজিত বসু (তৃণমূল), ডঃ শারদ্বত মুখার্জি (বিজেপি), সৌমজিত রাহা (সিপিএম), রঞ্জিত মুখার্জি (কংগ্রেস)।
ফ্য়াক্টর-- তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ, সিন্ডিকেট রাজ, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে এই বিধানসভা আসনে তৃণমূলের পিছিয়ে থাকা।
গতবারের ফল- তৃণমূলের সুজিত বসু প্রায় ৮ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন বিজেপি-র সব্যসাচী দত্তকে।
প্রচারে কে কোথায়- সুজিত বসুর দেওয়াল লিখুন, পোস্টার অনেক দেখা যাচ্ছে। তবে রোড শো, বাড়ি বাড়ি প্রচারে বিজেপি জোর টক্কর দিচ্ছে তৃণমূলের মন্ত্রী-প্রার্থীকে।
বরানগর বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (তৃণমূল), সজল ঘোষ (বিজেপি), সায়নদীপ মিত্র (সিপিএম), কল্যাণী চক্রবর্তী (কংগ্রেস)।
ফ্য়াক্টর-- নাগরিক পরিষেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া।
গতবারের ফল- দেড় বছর আগে হওয়া উপনির্বাচনে তৃণমূলের সায়ন্তিকা প্রায় ৬ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন বিজেপির সজল ঘোষ-কে। সজলের থেকে প্রায় ৫ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছিলেন সায়ন্তিকা।
প্রচারে কে কোথায়- সমানে সমানে
পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র
প্রার্থীরা- তীর্থাঙ্কর ঘোষ ((তৃণমূল), রত্না দেবনাথ (বিজেপি), কলতান দাশগুপ্ত (সিপিএম)।
ফ্য়াক্টর-- অভয়া-কে নিয়ে আবেগ, নারী নিরাপত্তা, তৃণমূল সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসন নিয়ে ক্ষোভ।
গতবারের ফল- ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে ২৫ হাজার ভোটে বিজেপির সন্ময় ব্যানার্জি-কে হারিয়েছিলেন তৃণমূলের নির্মল ঘোষ। এখানকার পাঁচবারের বিধায়ক নির্মল ঘোষের ছেলে তীর্থাঙ্কর এবার তৃণমূলের হয়ে লড়ছেন।
প্রচারে কে কোথায়