
রাজ্যজুড়ে জন্ম ও মৃত্যুর শংসাপত্র দেওয়া এবং তা ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে একাধিক চরম গাফিলতি ও ভুয়ো নথির হদিশ মেলার পর কড়া পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের (West Bengal Govt)। নবান্নে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন থেকে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল ঘোষণা করেন, এবার থেকে জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র জারির ক্ষেত্রে কোনও রাজনৈতিক বা জনপ্রতিনিধি—যেমন গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান, পুরসভার চেয়ারম্যান বা মেয়র—সরাসরি কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না। এই শংসাপত্র দেওয়ার সম্পূর্ণ ক্ষমতা ন্যস্ত করা হচ্ছে কেবল স্থায়ী সরকারি আধিকারিকদের ওপর।
মুখ্যসচিব জানান, ইতিমধ্যেই রাজ্য মন্ত্রিসভা এই সংক্রান্ত নতুন নিয়মে অনুমোদন দিয়েছে এবং আগামী দু’-এক দিনের মধ্যেই এর সরকারি নির্দেশিকা কার্যকর করা হবে। যাচাই অভিযানে ধরা পড়েছে হাজার হাজার ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেট নবান্নে এই সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যসচিবের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি কলকাতা পুলিশের সিপি । মুখ্যসচিব জানান, সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেট প্রদান ও জাল ডিজিটাল রেকর্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র দফতর, সিআইডি এবং রাজ্য ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর কাছ থেকে রিপোর্ট পাওয়া যায়।
বিলম্বিত শংসাপত্র পরীক্ষার জন্য নেওয়া ৪৬,৯৯৮টি বিলম্বিত জন্ম শংসাপত্রের মধ্যে ১১,৩৯০টি ভুয়ো বা বেআইনি বলে প্রমাণিত হয়েছে যা প্রায় ২৫ শতাংশ । ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া পুরোনো রেকর্ড ডিজিটাইজ করার কাজে ১১.২৪ লক্ষ আবেদনের মধ্যে প্রায় ১.৮০ লক্ষ রেকর্ড ভুয়ো বা অসংগতিপূর্ণ পাওয়া গেছে যা প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ। মুখ্যসচিব স্পষ্টভাবে জানান, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলিতেই এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে।
১৯৬৯ সালের কেন্দ্রীয় "Registration of Births and Deaths Act"-এর আওতায় রাজ্য সরকারের রুল তৈরির ক্ষমতা রয়েছে। ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালে তৎকালীন সরকারের সময় জনপ্রতিনিধিদের যেমন পঞ্চায়েত প্রধান , পুর-চেয়ারম্যান বা মেয়রের হাতে সাব-রেজিস্ট্রারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা সরকারি চাকরির কোড অফ কন্ডাক্ট বা সার্ভিস রুলের আওতায় না থাকায় দায়বদ্ধতার অভাব তৈরি হচ্ছিল।
১. একমাত্র সরকারি কর্মচারী: জেলা শাসক বা জেলা রেজিস্টার এখন থেকে প্রতিটি ব্লক, পঞ্চায়েত বা পুরসভার জন্য নির্দিষ্ট স্থায়ী সরকারি আধিকারিককে যেমন পঞ্চায়েত সেক্রেটারি, এক্সটেনশন অফিসার, হেলথ অফিসার বার্থ/ডেথ রেজিস্টার হিসেবে মনোনীত করবেন।
২. ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও মুচলেকা: যে সরকারি অফিসার শংসাপত্র ইস্যু করবেন, তাঁকেই সলেম আন্ডারটেকিং বা মুচলেকা দিতে হবে। অনিয়ম হলে সার্ভিস রুল ও সিভিল-ক্রিমিনাল আইনে চরম আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
৩. কেন্দ্রীয় পোর্টালে সংযুক্তি: আগামী ৩ মাসের মধ্যে রাজ্য নিজস্ব ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ সরে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘CRS’ পোর্টালে ১০০ শতাংশ যুক্ত হবে।
মুখ্যসচিব জানান, আজ সকাল ১১টা থেকে রাজ্যজুড়ে ৩,৩৩৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত, ১২৫টি পুরসভা এবং ৭টি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে সিভিল ও পুলিশ অফিসাররা বিশেষ অভিযান শুরু করেছেন। সব পুরোনো ও চলমান রেজিস্টার খতিয়ে দেখে তা সিগনেচার ও স্ক্যান করে সরকারি হেপাজতে নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। যাদের বার্থ সার্টিফিকেট বৈধ ও সঠিক রয়েছে, তাদের কোনো সমস্যা হবে না। সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে মুখ্যসচিব জানান, "জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং আর্থিক নিরাপত্তার সুরক্ষায় রাজ্য সরকার কোনো আপস করবে না। যারা বেআইনিভাবে ভুয়ো কাগজপত্র তৈরি করেছে বা যারা তা ইস্যু করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"