
রাত পোহালেই রাজ্যে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। এই দফায় হতে চলা ১৫২টি আসনের বেশিরভাগ জায়গাতেই চাপে আছে তৃণমূল কংগ্রেস। প্রথম দফায় জোড়াফুলকে নিয়ে বলা হচ্ছে, পাহাড়ে আশা নেই, উত্তরবঙ্গে বেশ চাপ, জঙ্গলমহলে ব্যথা আছে।
পূর্ব মেদিনীপুরে শুভেন্দুর দাপটে পুরোপুরি কোণঠাসা। বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় ব্য়াকফুটে। বীরভূমে একাধিপত্যে থাবা। পশ্চিম মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুরে মাথা তুলে দাঁড়াতে সমস্য়া। প্রথম দফায় যে সব কারণে বেশ চাপে আছে তৃণমূল, জেনে নিন সেই কারণগুলি।
আরজি কর কাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে যে আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল, তা এখনও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি ডিএ এবং শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়েও গত কয়েক বছরে বড় আন্দোলন হয়েছে। এই একের পর এক বড় ইস্যুকে ঘিরে মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের সরকারের ১৫ বছর ধরে চলা শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ট্রেন, বাস থেকে পাড়ার মোড়ে সব জায়গাতেই তৃণমূলকে নিয়ে সমালোচনার সুর শোনা যাচ্ছে। প্রথম দফার ভোটের আগে এই বিষয়টাই তৃণমূলের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে।
রাজ্যে SIR-এ প্রক্রিয়ার পর অনেক ভুতুড়ে ভোটার, জাল ভোটার, ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। যা অনেক সময়ই তৃণমূলকে বেশ কিছু আসনে জিতিয়ে আনতে সাহায্য করত। কিন্তু এবার আর সেটা হওয়ার নেই। বেশ কিছু আসনেই তৃণমূলের জয়ের ব্যবধানের থেকে SIR-এ নাম বাদ পড়ার সংখ্যা অনেক বেশি। তৃণমূলের নিশ্চিত সংখ্য়ালঘু গড়েও বেশ কয়েক লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে। সেটা নিশ্চিতভাবেই দিদির কপালে হাত ফেলেছে।
রাজ্যে ভোট শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করতে এবার বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কেন্দ্রীয় বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনির কড়া প্রহরা, রাজ্যের প্রতিটি বুথে ক্য়ামেরার নজরদারিতে চলবে ভোটগ্রহণ। কমিশনের এই বজ্র আটুনিতে অতীতে তৃণমূলকে সাহায্য করা বেশ কিছু বিষয় এবার আর মিলবে না। কমিশনের বজ্র আটুনি তাই তৃণমূলকে চিন্তায় রাখছে।
উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল। আলিপুরদুয়ার থেকে বীরভূম। প্রথম দফায় যে ১৬টি জেলায় ভোটগ্রহণ হবে তার বেশিরভাগ জায়গাতেই তৃণমূলের সমস্য়াগুলো পাহাড়প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালদায় এবার তৃণমূলের চিন্তা সবচেয়ে বেশি। মুর্শিদাবাদে গতবারের মত ২২-এ ২০ তো হবেই না, বরং অনেক নিশ্চিত আসনে হারতে হতে পারে। বীরভূমে এবার আসন কমে অর্ধেক হতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুর নিয়ে আশা ক্রমশ কমছে। পশ্চিম বর্ধমান ও পশ্চিম মেদিনীপুর দলীয় কোন্দল চরমে উঠেছে। সব মিলিয়ে বেশিরভাগ জেলাতেই পুরোপু চাপে রয়েছে রাজ্যের শাসক দল।
SIR- ইস্যুকে ঘিরে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশের ক্ষোভ এবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান। সংখ্য়ালঘুদের নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের কিছু মন্তব্য তৃণমূলের ভোটব্য়াঙ্কে বড় ক্ষতি করতে পারে। এসআইআর আন্দোলনে মাঠে নেমে নওসাদ সিদ্দিকির সক্রিয় ভূমিকা সংখ্যালঘুদের মধ্যে নজর কেড়েছে। পাশাপাশি মালদায় বামেদের এবং মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরে কংগ্রেসের কয়েকজন স্থানীয় নেতার তৎপরতাও আলোচনায়। এর ফলে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক এবার তৃণমূল, আইএসএফ, কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে ভাগ হয়ে যেতে পারে বলেই আশঙ্কা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হুমায়ুন কবীরের-এর জেইউপি এবং আসাউদ্দিন ওয়েইসি-র উপস্থিতি, যা সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ আরও জটিল করছে। সব মিলিয়ে, গতবার যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের উপর ভর করে 'দিদি' ক্ষমতায় ফিরেছিলেন, সেই শক্ত ঘাঁটিতেই এবার ফাটল ধরতে পারে, এমনই ইঙ্গিত মিলছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে।
আলিপুরদুয়ারের চা বাগানই হোক বা ঝাড়গ্রামের জঙ্গলমহলের প্রান্তিক মানুষরা- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাজে একযোগে ক্ষুব্ধ সবাই। শিল্প নেই, কাজ নেই। প্রথম দফায় প্রান্তিক মানুষের ভোট নিয়ে তাই বড় চিন্তায় তৃণমূল।
ঝাড়গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর ঝালুমড়ি খাওয়া বা বিভিন্ন জায়গায় অমিত শাহ-র রোড শো। কিংবা উত্তরবঙ্গ জুড়ে যোগী আদিত্যনাথ, হিমন্ত বিশ্বশর্মার আক্রমণাত্মক প্রচার। অথবা খড়গপুরে মিঠুন চক্রবর্তী থেকে নন্দীগ্রামে কঙ্গনা রানওয়াত, কিংবা উত্তরবঙ্গে হেমা মালিনী, মৈথিলী ঠাকুরের মত তারকাদের রোড শো, জনসভা। পাশাপাশি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা থেকে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির প্রচার। রাজ্যে প্রথম দফার ভোটে এবার বিজেপির প্রচার বেশ পরিকল্পিত, সুসংগঠিত ও মজবুত দেখিয়েছে। বিজেপির হাইপ্রোফাইল প্রচার নিয়ে আম জনতার উন্মাদনা তৃণমূলকে তাই চিন্তায় রেখেছে।
বীরভূম, পুরুলিয়া থেকে আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান। বিভিন্ন জেলা থেকে দলের মাঝারি ও নিচু তলার কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যে নানা রিপোর্ট আসছে। নিচুতলার অনেকেই কাজ না করার বিষয়টি প্রথম দফার ভোটে মমতাকে চাপে রাখছে।
তৃণমূলকে নিয়ে বলা হয়, পাঁচ বছর কাজ না করেও ভোটে জেতার মন্ত্র তারা জানে, ভোটের দিন টি-২০ স্টাইলে চালিয়ে খেলে নির্বাচনে জিতে। কথাগুলোর মানে সবার জানা। ভোটের দিন তৃণমূলের কর্মীরা বুথ ম্যানেজ থেকে এমন নানা কাজ করে যা ভোটের চিত্রকে বদলে দেয়। তবে এবার কমিশনের কড়াকড়িতে তৃণমূলের ভোটের দিন টি-২০ স্টাইলে খেলতে পারবে কি না, তা নিয়ে পুরোপুরি সংশয় আছে। তাই দিদির চিন্তা বাড়ছে।
তৃণমূলের পরিকল্পনা ছিল, ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা বাড়িয়ে বাজিমাত করা। সেইমতো ভোটের মুখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বাড়িয়ে দেন। কিন্তু তৃণূমলকে এবার এই ইস্যুতে কোনও সুবিধা তুলতে দেয়নি বিজেপি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা মাসে ৩ হাজার টাকার অন্নপূর্ণা ভাতা, মমতার বেকার ভাতার বদলে জব কার্ডের মত বিষয়গুলি প্রচারের সামনে নিয়ে দিদিকে পুরোপুরি চাপে রেখেছে গেরুয়া শিবির। প্রথম দফার ভোটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাড়ানোর ইস্যুটিও মমতার পালে হাওয়া দেবে না বলে মনে করেই চিন্তায় তৃণমূল শিবির।
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.