একের পর এক হিট নাম্বার। ম্যায়-নাগিন তু সপেরা। এক আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া দৃষ্টি নিয়ে শরীরি বিভঙ্গে নেচে চলেছেন শ্রীদেবী। আর দুলে দুলে বিন বাজাচ্ছেন অমরীশ পুরী। নাগিনার এই ডান্স নাম্বারকে প্রত্যক্ষ করার জন্য তখন সকলে চোখ সাটিয়ে রাখত চিত্রাহারে। কেবল টিভি-র যুগ থেকে বহু পিছনে থাকা সেই সময় দূরদর্শনের চিত্রাহার ছিল হিন্দি সিনেমার সব ভিডিও গানের খাঁটি বিনোদন। শুধু কি নাগিনা-এর এই গান, হাওয়া-হাওয়া ই-তে শ্রীদেবীর সেই জাপানি পাখা নাড়ার স্টাইলের নাচ- চোখের পাতার ঘন-ঘন ওঠা-নামা করানো। আজও যেন নস্টালজিক করে তোলে নব্বই দশকের কিশোর ও তরুণ মনকে। এসবের রেশ কাটতে না কাটতেই এক দো তিন-এ হিলহিলে শরীর নিয়ে থাই বের করা স্কার্ট, আর কাঁধের একদিক থেকে কেটে নেমে যাওয়া পোশাক- যা মাধুরী দীক্ষিতকেও এক কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে রেখেছে- এই সবেরই সৃষ্টিকর্তা ছিলেন একজন- তাঁর নাম সরোজ খান। ছিলেন কোরিওগ্রাফার। কিন্তু, সরোজ খান কোনও সিনেমার কোরিওগ্রাফি করছেন মানে সেটা নায়ক-নায়িকাদের থেকে কম গ্ল্যামারাস ছিল না। এহেন সরোজ খানও এই সঙ্কটের সময়ে পাড়ি জমালেন অমৃতলোকে। বলিউড হারাল তাঁর আরও এক কিংবদন্তিকে। বৃহস্পতিবার গভীররাতে মুম্বইয়ের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বলিউডের কিংবদন্তি কোরিওগ্রাফার সরোজ খান। 

বয়স হয়েছিল। ভুগছিলেন বার্ধক্য জনিত নানা শারীরিক অসুবিধায়। হাঁটু-তে দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা হচ্ছিল। তাই হাঁটু-র ব্যাথাতে সেভাবে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নাচের ডিরেকশন দিতে পারতেন না। এসেবর সত্ত্বেও কাজ থামাননি সরোজ খান। ১৯৪৮ সালে বম্বে আধুনা মুম্বই-এর বুকেই তাঁর জন্ম। বলতে গেলে স্বাধীনতার এক বছর পরেই। দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে এসেছিল। সরোজ খান-এর আসল নাম নির্মলা নাগপাল। বলিউডে কেরিয়ার গড়তে গিয়ে তিনি সরোজ নাম নিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে যে ছবির জন্য নির্মলা নাম বদলে সরোজ হয়েছিলেন- সেই ছবিটি ছিল গীতা মেরা নাম। কোরিওগ্রাফ হিসাবে কাজ শুরুর আগেই অবশ্য সরোজ খান শিশু অভিনেতা হিসাবে বলিউডে কাজ শুরু করেছিলেন। 

২০ জুন শ্বাসকষ্ঠ জনিত সমস্যার জন্য সরোজ খানকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরপর থেকেই তিনি গুরুনানক হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি ছিলেন। সরোজ-এর শারীরিক অবস্থা ভালো নেই, সে খবর বারবারই এসেছে। মনে করা গিয়েছিল লড়াকু সরোজ হয়তো এযাত্রায় সঙ্কটকে সামলিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু, বৃহস্পতিবার গভীররাতে সব লড়াই শেষ হয়ে গেল। ২০০০-এর বেশি গানে কোরিওগ্রাফ করা সরোজ খান একগুচ্ছ অসামান্য কাহিনিকে পিছনে ফেলে চলে গেলেন তারাদের ভিড়ে। 

ফিল্মি কেরিয়ারে তিন বার মনোনিত হয়েছেন জাতীয় পুরস্কারে। এরমধ্যে একবার সম্মানিত হয়েছেন দেবদাস-এর ডোলা-রে ডোলা-রে গানের কোরিওগ্রাফির জন্য। এছাড়াও এর আগে তেজাব ছবিতে মাধুরীর উপর আরোপিত এক দো তিন গানের কোরিওগ্রাফির জন্য মিলেছিল জাতীয় সম্মান। ২০০৭ সালে জব উই মেট সিনেমায় ইয়ে ইশক হ্যায়-এর কোরিওগ্রাফি করেও পেয়েছিলেন জাতীয় সম্মান। 

সম্প্রতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলির মধ্যে ছিল- কঙ্গনা রানাওয়াত-এর মণিকর্ণিকা, তনু ওয়েডস মন্নু রিটার্নস এবং ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি কলঙ্ক। আর সেই গানের কোরিওগ্রাফি আরোপিত হয়েছিল মাধুরী দীক্ষিতের উপরে। যে মাধুরী-র সঙ্গে এক দো তিন-এর কোরিওগ্রাফির হাত ধরে তৈরি হয়েছিল এক আত্মার সম্পর্ক, সেই মাধুরীর সঙ্গেই তাঁর শেষ কাজ করেছিলেন সরোজ। সিনেমার বাইরে একাধিক টেলিভিশন রিয়্যালিটি শো করেছিলেন সরোজ। বলতে গেলে একজন কোরিওগ্রাফারের দুরন্ত কাজ তাঁকে জনপ্রিয়তার কোন শিখরে নিয়ে যেতে পারে তা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন সরোজ খান। শুক্রবারই মুম্বইয়ের মালাডের মালভানি-তে সরোজ খান-এর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।