তপন মল্লিক: বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে প্রথম ঘরে ঢোকার দৃশ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর অভিনয় জীবন। মাত্র ২০ মিনিটের স্ক্রিনটাইমে সেই কিশোরী বধূটি এখনও সিনেমাতে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে অমর হয়ে আছে। প্রসঙ্গত, তখন বোম্বাইয়ের বেশ কিছু সিনেমা থেকে উঠে আসছিল আইকনিক নারীচরিত্র। মেহবুব খানের মাদার ইন্ডিয়া,  গুরু দত্তের প্যায়াসা, কে আশিফের মুঘল-এ-আজম এমনকি বাংলায় ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা-তেও। কিন্তু কার্যত তাঁরা মানবী থেকে মাতৃরূপী দেবী হয়ে উঠেছিল। তবে অপুর সংসারের অপর্ণা দেবী নয়, রোমান্টিকতার প্রতীক হয়ে আছে। যে কারণে শর্মিলা ঠাকুরের নাম বললেই অপর্ণার মুখ ভেসে ওঠে। তবে এরপরেই আমরা শর্মিলাকেও দেখি দেবী হয়ে উঠতে। এক ধর্মান্ধ সামন্ততান্ত্রিক জমিদার তাঁর পুত্রবধূ দয়াময়ীকে দেবী বানিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।    

১৯৫৯-এ ‘অপুর সংসার’, ’৬০-এ ‘দেবী’, সত্যজিৎ রায়ের দুটি ছবিতেই শর্মিলা ঠাকুর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এরপর ’৬৩-তে শর্মিলার তিনটি ছবি মুক্তি পায়- উত্তমকুমারের সঙ্গে ‘শেষ অঙ্ক’, তপন সিংহের ‘নির্জন সৈকতে’ এবং পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘ছায়া সূর্য’। এই তিনিটি ছবিতেও শর্মিলা ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। এরপর বোম্বে থেকে তাঁর ডাক আসে; শক্তি সামন্তের ‘অ্যান ইভিনিং ইন প্যারিস’ ছবিতে।  ১৯৬৭ সালে ওই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর রীতিমতো বিতর্ক তৈরি করেছিল। বিকিনি পরে নীল সমুদ্রের উপর দিয়ে স্কি করছেন নায়িকা শর্মিলা ঠাকুর। বলা যায় প্রথমবার ট্যাবু ভেঙ্গে বিকিনি পরে রূপালী পর্দায় ভেসে ওঠেন নায়িকা শর্মিলা ঠাকুর। আজ এ ধরণের দৃশ্য ছাড়া ছবির কথা ভাবাই যায় না। কিন্তু,  পাঁচ দশক আগে ওই দৃশ্য দেখে চারিদিকে গেল-গেল রব পড়ে গিয়েছিল। সেই সময় বিকিনি পরা ভারতীয় নারীর পক্ষে, বিশেষ করে সিনেমায় খুবই কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু শর্মিলা ঠাকুর সেই কাজটি করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। একটা সময় জড়তার ভিত, গাথনি ভাঙার কাজ তো শুরু হয়েই যায়। কিন্তু সেই শুরুটা যে কেউ করে উঠতে পারেন না। সিনেমা ছাড়াও শর্মিলা ম্যাগাজিনের কভার গার্ল হওয়ার জন্য বিকিনি শ্যুট করিয়েছিলেন। 

বিখ্যাত ঠাকুর বংশের মেয়ে হয়েও শর্মিলা গেল শতাব্দীর সত্তর দশক শুরুর আগে ছক ভাঙ্গা শুরু করে দিয়েছিলেন। যার দিদিমা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি, অন্যদিকে প্রিন্স দ্বারকানাথের ভাই গিরীন্দ্রনাথের ছেলে গুণেন্দ্রনাথ; তাঁর ছেলে গগনেন্দ্রনাথের পুত্র কণকেন্দ্রনাথের দৌহিত্রী হলেন শর্মিলা ঠাকুর। কেবলমাত্র সিনেমাতে অভিনয় ক্ষেত্রেই নয় শর্মিলা প্রথা ভেঙেছিলেন ব্যক্তি জীবনেও। সনাতন বাঙালি হিন্দু পরিবারের মেয়ে হয়ে অবাঙালি মুসলমান পরিবারে বিয়ে করেছিলেন। 


শর্মিলা তাঁর রূপকে উন্মুক্ত করেছিলেন ‘আরাধনা’ ছবিতে; ‘রূপ-তেরা মস্তানা’ গানে, টু-পিসে ফোটো শ্যুট করে। সেই ফোটো শ্যুট সেই সময় এমন হইচই ফেলেছিল যে দেশজুড়ে মৌলবাদীরা হুঙ্কার দিয়েছিলেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তাঁদের প্রচ্ছদে শর্মিলার সেই ছবিকে জায়গা দিয়েছিল। আমেরিকান সেই পত্রিকা শর্মিলাকে নিয়ে কভার স্টোরিও করেছিল। বোম্বাইয়ের সেই ‘আরাধনা’ ছবির সময়েই তাকে ফের ডেকে নিলেন সত্যজিৎ রায়; তাঁর ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-তে। এবার শর্মিলা অপুর সংসারের অপর্ণা কিংবা দেবীর দয়াময়ী এমনকি নায়ক-এর অদিতি নয়। অপর্ণা আধুনিক, শহুরে, শিক্ষিত মেয়ে। অপর্ণার যুক্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দিয়েই প্রধান পুরুষ চরিত্র খুঁজে পায় তার মানবিকতা। তার মানে কেবল প্রথা ভাঙা নয়, তাঁর অভিনয় দক্ষতায় যে বৈচিত্র তাকে পুঁজি করে সত্যজিৎ শর্মিলাকে ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে ভাবতে বাধ্য হন। 

শর্মিলার বোম্বাই অভিযান শুরু শক্তি সামন্তর ‘কাশ্মির কি কলি’ থেকে। বুদ্ধিদীপ্ত সৌন্দর্যের সুবাদে তিনি রাতারাতি তারকা হয়ে যান তিনি। একের পর এক মুক্তি পায় ‘ওয়াক্ত’, ‘অনুপমা’, ‘দেবর’, ‘শাওয়ান কি ঘাটা’। সবগুলি বাণিজ্যিকভাবে সফল। একটা সময় শর্মিলা ঠাকুর মানেই ছবির বাণিজ্যিক সফলতা ছিল নিশ্চিত। ‘আমনে সামনে’, ‘মেরে হামদাম মেরে দোস্ত’, ‘হামসায়া’, ‘সত্যকাম’, ‘তালাশ’-সব কটি ছবিই সফল| তবে সব সাফল্য ছাড়িয়ে যায় ১৯৬৯-তে সুপার-ডুপার হিট ‘আরাধনা’। ১৯৬৯ সালে ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে ভারতীয় ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক মনসুর আলি খান পতৌদি ও শর্মিলা ঠাকুর বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। বিয়ের পরও শর্মিলার ক্যারিয়ারে ভাটা পড়েনি। ১৯৭০-এ মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিন রাত্রি’, ৭১-এ ‘সীমাবদ্ধ’।  

রাজেশ খান্নার সঙ্গে ‘সফর’, ‘অমর প্রেম’, ‘রাজারানি’, ‘দাগ’, শশী কাপুরের সঙ্গে ‘আ গালে লাগ যা’,  এই জুটি ফিরে আসে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় ‘গেহরি চোট’ ছবিতে। এরপর গুলজারের ‘মওসাম’ ছবির সুবাদে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘরে তোলেন শর্মিলা ঠাকুর। পরবর্তীতে চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে ‘মন’, ‘ধাড়কান’-সহ বহু ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। আবার আরেকবার সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান ২০০৩ সালে গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘আবার অরণ্যে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য।